সাজোরে ‘আমীন’ বলা প্রসঙ্গ- শায়খুল হিন্দ আল্লামা ম

সাজোরে ‘আমীন’ বলা প্রসঙ্গ- শায়খুল হিন্দ আল্লামা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী (রহ.)
সাজোরে ‘আমীন’ বলা প্রসঙ্গ

শায়খুল হিন্দ আল্লামা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী (রহ.)

যে সব নামাযে উচ্চস্বরে সূরা ফাতেহা পাঠ করা হয় সেখানে সূরা ফাতেহার পরে জোরে অথবা আস্তে ‘আমীন’ বলা নিয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মাঝে মতপার্থক্য বিরাজমান। যার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নে বর্ণিত হচ্ছে-

হানাফী মাযহাব

হানীফাদের মতে ইমাম মুক্তাদী সবার জন্যই ‘আমীন’ বলা সুন্নত; তবে তা অনুচ্চস্বরেই সুন্নত। এখানে দুটি সুন্নত পৃথক পৃথক। প্রথমত আমীন বলা। দ্বিতীয়ত অনুচ্চস্বরে বলা। আদ্দুররুল মুখতারের ভাষ্য-

অর্থাৎ-আর নামাযের সুন্নত হচ্ছে ছানা, আউযুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ ও আমীন বলা এবং এই চারটি অনুচ্চস্বরে পড়া-।

وكونه سرأ-এর ব্যাখায় আল্লামা শামী (রহ.) টীকায় লিখেছেন-

আদ্দুররুল মুখতার প্রণেতা سرأ كون( مصدركان) উহ্যের \\\’খবর\\\’ (বিধেয়) বানিয়েছেন। যাতে এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, এই চারটি অনুচ্চস্বরে পড়া দ্বিতীয় সুন্নত। সুতরাং এই চারটি বলার সুন্নত আদায় হয়ে যাবে, যদিও (সজোরে) বলে। (অবশ্য অনুচ্চস্বরে বলার সুন্নত আদায় হবে না, যা এক পৃথক সুন্নত)’

মালেকী মাযহাব

মালেকীদের ফতোয়াসিদ্ধ মাযহাব এই যে, আস্তে ‘আমীন ‘বলা মুস্তাহাব আল্লামা দারদীর (রহ.) শরহে সগীর-এ লিখেছেন-

অর্থাৎ-প্রতি নামাযেই আস্তে আমীন বলা মুস্তাহাব।-

হাম্বলী মাযহাব

হাম্বলীদের নিকট ইমাম মুক্তাদী সবারই জোরে ‘আমীন’\’ বলা সুন্নত। ইবনে কুদামা (রহ.) লিখেছেন-

অর্থাৎ-যে নামাযে জোরে কেরাত পড়া হয় সে নামাযে ইমাম মুক্তাদী সবারই জোরে আমীন বলা সুন্নত। আর যে নামাযে আস্তে কেরাত পড়া হয় সেখানে আস্তে আমীন বলা সুন্নত-।

শাফেয়ী মাযহাব

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) এর প্রাচীন মত হচ্ছে \\\’জাহরী\\\’ নামাযে ইমাম মুক্তাদী সবার জন্য জোরে আমীন বলা সুন্নত। আর তাঁর নতুন মত হচ্ছে শুধু ইমামের জোরে আমীন বলা সুন্নত। আর মুক্তাদীদের আস্তে আমীন বলা সুন্নত। তবে শাফেয়ীদের কাছে ফতোয়াসিদ্ধ মত হচ্ছে প্রাচীনটিই। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) লিখেছেন, \\\’ফতোয়াসিদ্ধ মত এটিই।\\\’ ইমাম রাফেয়ী (রহ.) ও একে প্রাধান্র দিয়েছেন। নতুন মতের ওপর কোন শাফেয়ী ইমামই ফতোয়া দেননি।

উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা একটা কথা প্রতীয়মান হল যে, আমীন আস্তে হোক বা জোরে, জায়েয হওয়ার ব্যাপারে সব মাযহাবই একমত। তবে দুই ইমামের মতে আস্তে বলা উত্তম, অপর দুই ইমামের মত জোরে বলা উত্তম। পরিশেষে বলা যায়, মতপার্থক্য শুধু উত্তম ও অনুত্তম সম্পর্কে; জায়েয ও নাজায়েয সস্পর্কে নয়।

আমীনবিষয়ক হাদীস

এ বিষয়ে বিভিন্ন রেওয়ায়েত রয়েছে। আস্তে বলার রেওয়ায়েত আছে, জোরে বলারও আছে। জোরে আমীন বলার হাদীস যতগুলো আছে সব সহীহ কিন্তু \\\’সরীহ\\\’ তথা সুস্পষ্ট নয়। যেগুলো সরীহ সেগুলো আবার সহীহ নয়। যেমন সবচেয়ে বিশুদ্ধ হাদীস এই যে-

অর্থাৎ-ইমাম আমীন বললে তোমরাও আমীন বল। কেননা যার আমীন বলা ফেরেশতাদের আমীন বলার সাথে মিলে যাবে তার পেছনের সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে-।

বর্ণিত হাদীসটি সহীহ। এর দ্বারা ইমাম বুখারী রহ. \\\’সজোরে আমীন\\\’ বলা প্রমাণ করেছেন। কিন্তু হাদীসখানি দাবি প্রমাণে সরীহ নয়। কেননা সহীহ মুসলিম ও সুনানে আবু দাউদ-এ এই হাদীসের রাবী ইমাম ইবেনে শিহাব জুহরী রহ. এর রেওয়ায়েতের শেষে একথাও রয়েছে যে-\\\’আর হুজুর সা. ও আমীন বলতেন।\\\’

হুজুর সা. যদি জোরে আমীন বলবেন তাহলে ইমাম জুহরী (রহ.) এর তা বলার দরকা র পড়ল কেন?

এছাড়া সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম-এ এই হাদীসের আরো কিছু শব্দও বিধৃত হয়েছে এভাবে-

অর্থাৎ-রাসূলুল্লাহ (রা.) ইরশাদ করেন, ইমাম যখন বলেন তখন তোমরা আমীন বল। যার কথা ফেরেশতাদের কথার সাথে মিলে যাবে তার সব গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’

এ হাদীসে মুক্তাদীদের \\\’আমীন\\\’ বলা ইমামের \\\’আমীন\\\’ বলার উপর ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর ব্যাপারটা তখনই যুক্তিসঙ্গত হবে যখন আমীন আস্তে বলা হবে; নতুবা ولا الضالين বলার পরে \\\’আমীন\\\’ বলাকে ঝুলিয়ে রাখার কোনও মানে থাকে না। আর ইমামের যখন আস্তে আমীন বলা প্রমাণিত হল তখন মুক্তাদীরা অবশ্যই আস্তে বলবে।

আর এ হাদীসও হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, যেমনটি আগেও বর্ণিত হয়েছে, যখন একই হাদীস দুভাবে বর্ণিত হয়-একটিতে জোরের সাথে আরেকটিতে আস্তে তো একে সুস্পষ্ট বলা যায় কী করে?

এদিকে কিছু রেওয়ায়েত এমনও আছে যা \\\’সরীহ\\\’ কিন্তু সহীহ নয়। যেমন-

(১)হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজুর (রা.) এর হাদীস-২

অর্থাৎ-আমি শুনেছি, নবী করীম (সা.) ‘গাইরিল মাগযূবি আলাইহিম ওয়ালাদ দাললীন\\\’ বলে আমীন বলেছেন এবং আওয়াজকে টেনেছেন। আর এক রেওয়ায়েতে আছে, সজোরে আমীন বলেছেন। তৃতীয় রেওয়ায়েতে আছে, আমীন বলার সময় তাঁর আওয়াজটি উঁচু হত।’

হাদীসের শব্দগুলো সুফিয়ান ছওরীর রেওয়ায়েতের। এদিকে তাঁরই সঙ্গী ইমাম শো\\\’বা এই রেওয়ায়েতকে নিম্নোক্ত শব্দে বর্ণনা করেছেন-

\\\”নবী করীম (সা.) যখন \\\’গাইরিল মাগযূবি আলাইহিম ওয়ালাদ দাললীন\\\’ বলতেন তখন আমীন বলতেন। আমীন বলার সময় তাঁর আওয়াজ নিচু হত।’

\\\’মতন\\\’ (টেক্সট) ছাড়াও সুফিয়ান ছওরী ও শো\\\’বার মাঝে হাদীসের \\\’সনদ\\\’ নিয়েও মতপার্থক্য বিরাজমান। এ কারণে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম-এ তাঁদের রেওয়ায়েত ঠাঁই পায়নি। মুহাদ্দেসীনে কেরাম যদিও সুফিয়ান ছওরীর রেওয়ায়েতকে প্রাধান্য দিয়েছেন তথাপিও তারা সফলকাম পারেননি। কেননা শো\\\’বা (রহ.) এর সনদের উপর যেসব ওজর-আপত্তি তোলা হয়েছে, এর যথেষ্ট জবাবও প্রদান করা হয়েছে।

(২) সুনানে দারাকুতনীতে রেওয়ায়েত আছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা.) সূরা ফাতেহা পাঠ শেষ করে জোরে \\\’আমীন\\\’ বলতেন।

এই হাদীসটির সনদ বিশুদ্ধ নয়। কেননা এই সনদে ইয়াহইয়া ইবনে উসমান এবং তার উস্তাদ ইসহাক ইবনে ইবরাহীম যুবায়দী বিতর্কিত রাবী।

(৩) সুনানে দারাকুতনীতেই ইবনে ওমর (রা.)এর আরেকটি রেওয়ায়েত।

এটিও সহীহ নয়। কেননা এই সনদে \\\’বাহর সাক্কা\\\’ নামক একজন রাবী আছেন, যিনি যায়ীফ।

(৪) সুনানে ইবনে মাজহ-এ হযরত আলী (রা.) এর সূত্রে যে রেওয়ায়েত আছে- তাও বিশুদ্ধ নয়। কেননা এই সনদের ইবনে আবি লায়লা সগীর, যায়ীফ।

(৫) সুনানে ইবনে মাজাহ-এ হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত-

\\\”মানুষরেরা আমীন বলা ছেড়ে দিল; অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম\\\’গাইরিল মাগযূবি আলাইহিম ওয়াদ-দাললীন\\\’ বলা শেষে আমীন বলতেন।এত জোরে বলতেন যে, সামনের কাতারের মানুষজন তা শুনতে পেত আর তাতে গোটা মসজিদ কেঁপে ওঠত।\\\”

এ হাদীসটিও সহীহ নয়। কেননা এ হাদীস হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে আবু আব্দুল্লাহ বর্ণনা করেন। তার অবস্থা অজানা। আর তার শিষ্য বিশর ইবনে রাফে নোহায়েত যায়ীফ।। ইবনে হিব্বান (রহ.) তাঁর সম্পর্কে লেখেন, তিনি জাল রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন।

(৬) উম্মুল হোসাইন (রা.) বলেন, তিনি নবী করীম (সা.) এর পেছনে নামায পড়েছেন। যখন নবীজী \\\’ওয়ালাদ-দাললীন\\\’ পড়তেন তখন আমীন বলতেন। সেই আওয়াজ তিনি একেবারে পেছনের নারী-কাতারে দাঁড়িয়ে শোনতেন।

এই রেওয়ায়েতটিও সহীহ নয়। কেননা এই সনদে ইসমাঈল ইবনে মুসলিম মক্কী একজন যায়ীফ রাবী।

মোদ্দাকথা, \\\’সশব্দে আমীন\\\’ বলা সম্পর্কে যতগুলো রেওয়ায়েত \\\’সরীহ\\\’ তথা সুস্পষ্ট আছে তার একটাও সহীহ নয়।

পূর্বসূরিদের আমল

এবার একটু পূর্বসূরিদের আমল দেখা যাক। ইমাম ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) বলেন:-সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীদের সিংহভাগই আস্তে আমীন বলতেন-।

অবশ্য অল্পবয়সী সাহাবীদের যামানায় বিশেষ করে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.) জোরে আমীন বলার নিয়ম চালু করেন। তাঁর রাজধানী ছিল মক্কা। তাঁর থেকেই মক্কায় জোরে আমীন বলার রেওয়াজ চালু হয়। এ জন্যই ইমাম শাফেয়ী (রহ.), যাঁর জন্মভূমি মক্কা মুকাররমা ছিল, জোরে আমীন বলা মাযহাব অবলম্বন করেছিলেন। ওদিকে মদীনার দৃশ্যপট ছিল এর ব্যতিক্রম। ইমাম মালেক (রহ.) যাঁর কাছে মদীনাবাসীর আমলের যথেষ্ট গুরুত্ব রাখে, তিনি আস্তে আমীন বলার মত গ্রহণ করেছেন।

আস্তে \\\’আমীন\\\’ বলার দলিল

আস্তে \\\’আমীন\\\’ বলার শক্তিশালী দলিল, যা আগে সহীহ বুখারী ও মুসলিম-এর বরাতে বলা হয়েছে। যাতে ইমামের \\\’ওয়ালাদ-দাললীন\\\’ বলার পরে মুক্তাদীর \\\’আমীন\\\’ বলা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এই রেওয়ায়েতের কোন \\\’তাবীল\\\’ ও ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না। إذا أمن الإمام فأمنواএর ব্যাখ্যা হতে পারে যে, যখন ইমামের \\\’আমীন\\\’ বলার সময় আসে তখন মুক্তাদীও আমীন বলবে।

দ্বিতীয় দলিল : হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা.) এর হাদীস, যা হযরত শো\\\’বা রহ. বর্ণনা করেন, যার শব্দ হচ্ছে اخفض بها صوته

তৃতীয় দলিল : হযরত সামুরা (রা.) ও হযরত ইমরান (রা.) এর ঘটনা। হযরত সামুরা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) নামাযে তাকবীরে তাহরীমার পরে সামান সময় চুপ থাকতেন এবং \\\’ওয়ালাদ-দালীন\\\’ এর পরও কিছু সময় চুপ থাকতেন। হযরত ইমরান (রা.) দ্বিতীয় \\\’সাক্‌তা\\\’ (সামান্য সময় চুপ থাকা) কে অস্বীকার করেন। শেষে উভয়ে হযরত উবাই ইবনে কা\\\’ব (রা.) এর কাছে গেলেন। তিনি বললেন, সামুরার স্মরণই যথার্থ। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা.) \\\’ওয়ালাদ-দাললীন\\\’ এর পরও কিছু সময় চুপ থাকতেন। (এ চুপ থাকা আমীন বলার জন্য হত।)

চতুর্থ দলিল : হযরত ইবরাহীম নাখায়ী (রহ.) এর এই ইরশাদ যে, পাঁচটি বিষয় ইমাম আস্তে বলবেন-ছানা, আউযুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ, আমীন ও তাহমীদ।

আস্তে আমীন বলা আসল

আর জোরে বলা শিক্ষার জন্য

এখন চিন্ত্মার বিষয়, উপরোক্ত উভয়বিধ বর্ণনার প্রকৃত সুন্নত কোন্‌টি? এটি নির্ধারণে মুজতাহিদীনে কেরামের মাঝে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। হানাফী ও মালেকীদের কাছে প্রকৃত সুন্নত হচ্ছে আমীন আস্তে বলা। কেননা আমীন একটি দোয়া, আর দোয়ার প্রকৃতি হচ্ছে আস্তে করা। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) যতবারই আমীন জোরে পড়েছেন তা শুধু শিক্ষার জন্য পড়েছেন। যেমন, যেসব নামাযে কেরাত আস্তে পড়ার কথা সেসব নামাযেও তিনি মাঝে মধ্যে দু\\\’এক আয়াত জোরে পড়তেন, যাতে সাহাবায়ে কেরাম বুঝতে পারেন নবীজী এ রাকাতে অমুক সূরা পড়ছেন। এমনিভাবে হযরত ওমর (রা.) এর খেলাফতকালে একবার বাইরের এলাকা থেকে কিছু মানুষ দীন শিক্ষার উদ্দেশ্যে তাঁর খেদমতে এলে তিনি নামাযে জোরে ছানা পড়েছিলেন তাদের শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে।

আমাদের এ কথার প্রমাণ মেলে ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা.)এর হাদীসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দেস আবুল বিশ্‌র দোলাবী তাঁর \\\’কিতাবুল আসমা ওয়াল-কুনা\\\’-এ নিম্নোক্ত শব্দে উল্লেখ করেন-

রাসূলুলস্নুাহ (সা.) আমীন বলতেন। আমীন বলার সময় আওয়াজ উচ্চ করতেন। আমার বিশ্বাস যে তা আমাদের শেখানোর জন্যই ছিল।

ইমাম তাবারানী (রহ.) মুজামে কাবীর-এ হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজুর (রা.) এর রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন এভাবে-

\\\”আমি দেখেছি নবী করীম (সা.) নামায শুরু করেছেন। যখন তিনি সূরা ফাতেহা শেষ করেন তখন তিনবার আমীন বলেন।\\\”

হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) যিনি শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন এবং জোরে আমীন বলার জোরালো প্রবক্তা, তিনি এই হাদীসের মর্ম বয়ান করেন যে, ওয়ায়েল (রা.) তিন নামাযে নবীজীকে জোরে আমীন বলতে শোনেন। হাদীসের মর্ম এই নয় যে, একই রাকাতে তিনবার আমীন বলতে শুনেছেন। ইবনে হাজার (রহ.) এর এই মন্ত্মব্য মাওয়াহেব-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।

সুতরাং এ রেওয়ায়েতসমূহ এই সিধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য যথেষ্ট যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) সব সময়ই জোরে আমীন বলতেন না। কদাচিৎ লোকদের শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্য বলতেন। [ইমাম ইবনুল কায়্যিম হাম্বলী (রহ.) ও \\\’যাদুল মাআদ\\\’ (খ.১পৃ. ২৭৫, নবীজীর দোয়ায়ে কুনূত অধ্যায়) এ জোরে আমীন বলার এ উদ্দেশ্যই বর্ণনা করেছেন।] তিনি যদি সর্বদা জোরে আমীন বলতেনই তাহলে হযরত ওয়ায়েল রা. কে ما اراه الا ليعلمنا\\\’আমার বিশ্বাস যে তা আমাদের শেখানোর জন্যই ছিল\\\’ অথবা قال أمين ثلاث مرات \\\’তিন তিনবার আমীন বলেন\\\’ বলার প্রয়োজন পড়ত না।

সুফিয়ান ছওরী ও শো\\\’বা (রহ.) এর রেওয়ায়েতের সমন্বয়

এদিকে সুফিয়ান ছওরী ও শো\\\’বা (রহ.) এর রেওয়ায়েতের মতপার্থক্য নিয়ে কথা থেকে যায়। প্রকৃতপক্ষে এতে কোনও মতপার্থক্য নেই; বরং একই অবস্থার বিবৃতিগত ভিন্নতা। আওয়াজ টানা ও উচ্চকিত করার মর্ম হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বিশেষত ওই স্থানটিতে আমীন আস্তে বলেননি; বরং জোরেই বলেছিলেন। তবে যতজোরে তিনি সূরা ফাতেহা পড়েছিরেন ততজোরে আমীন পড়েননি; বরং আমীন পড়ায় তাঁর কণ্ঠ অপেক্ষাকৃত লঘু ছিল। যেমন ইমাম নাসায়ী (রহ.) এর ভাষ্য-

\\\”যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) \\\’ওয়ালাদ-দাললীন\\\’ পর্যন্ত্ম পৌছুলেন তখন আমীন বললেন, আমি (ওয়ায়েল ইবনে হুজুর) তা শোনলাম; অবশ্য আমি তাঁর পেছনেই ছিলাম।\\\”

অর্থাৎ হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজুর (রহ.) সামনের কাতারে নবীজীর পেছনেই দণ্ডায়মান ছিলেন, যেখানে সাধারণত আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.) দাঁড়াতেন। হযরত ওয়ায়েল (রা.)কে সম্মানবশত ওখানে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ওখানে দাঁড়িয়েই তিনি তাঁকে আমীন বলতে শুনেছিলেন। আর তাঁকেই শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল প্রিয়নবীর। এজন্য তিনি এতটুকু জোরে বলেছেন, যতটুকু জোরে বললে ওয়ায়েল (রা.) শুনতে পান। এই হচ্ছে خفض بها صوته (তাঁর আওয়াজ লঘু)এর মতলব।

সারসংক্ষেপ

\\\’আমীন\\\’ জোরে বলার এই বিস্তারিত আলোচনার সংক্ষিপ্তি এই দাঁড়াচ্ছে যে, হযরত শাইখুল হিন্দ (রহ.) চ্যালেঞ্জধারীদের কাছে দাবি করছেন যে, আমীন অনুচ্চস্বরে বলা যেখানে আসল আর জোরে বলাটা সাময়িক-সেখানে যে লোক সাময়িক ব্যাপারটি নিয়ে হম্বিতম্বি করে তাকে প্রথমেই নিজস্ব দাবিটা স্পষ্ট করেই বলতে হবে। নিজের দাবিটা স্পষ্ট করে তুলতে হবে। বলতে হবে, জোরে আমীন বলা সুন্নত এবং তা বিশদ্ধ ও সুস্পষ্ট হাদীস দ্বারা প্রমাণপুষ্ট। এ দুটি দিক ছাড়া দাবি প্রমাণিত হতে পারে না।

প্রথমত বাদীকে প্রথমে প্রমাণ করতে হবে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) \\\’সর্বদা\\\’ উচ্চশব্দে আমীন বলতেন। অর্থাৎ প্রিয়নবী (সা.)এর রোজকার আমল ছিল উচ্চশব্দে আমীন বলা। এটি ছাড়া সুন্নত প্রমাণ হতে পারে না। কেননা রেওয়ায়েতের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে দেখা গেছে, উচ্চস্বরে আমীন নিছক শিক্ষার উদ্দেশ্যেই ছিল, ভিন্ন কোন উদ্দেশ্যে নয়। সুতরাং \\\’সর্বদা\\\’ বা \\\’দাওয়াম\\\’ প্রমাণ করতে হলে ভিন্ন দলিল লাগবে, যা বাদীর কাছে নেই।

দ্বিতীয়ত কিংবা বাদীকে এতটুকু প্রমাণ করতে হবে যে, প্রিয়নবী (সা.)-সর্বশেষ নামাযটি\\\’তে উচ্চশব্দে আমীন বলেছেন। যাতে রহিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনাটুকুও খতম হয়ে যায়। কেননা যদি সর্বশেষ নামাযে উচ্চশব্দে আমীন বলা প্রমাণিত না হয়, তবে বলা যেতে পারত এটি পূর্ববতী আমল যা এই আমল দ্বারা রহিত হয়ে গেছে। সুতরাং \\\’নসখ\\\’এর সম্ভাবনা খতম করার জন্য জরুরি হচ্ছে বিলকুল আখেরি নামাযে জোরে আমীন বলা প্রমাণ করা।

উপরিউক্ত দুটি ব্যাপারের কোনও একটি প্রমাণ করা ছাড়া উচ্চশব্দে আমীন বলা যেমন বাকি থাকতে পারে না, তেমনি \\\’মনসূখ\\\’ হয়নি তাও বলা যাবে না; বরং উভয়টির সম্ভাবনা সমানভাবে থেকে যায়। কেননা উচ্চশব্দজনিত রেওয়ায়েত সর্বদা উচ্চশব্দে বলার ও উচ্চশব্দ রহিত হওয়ার ধারবাহিকতায় নিশ্চুপ। তাই উচ্চশব্দের রেওয়ায়েত অনুচ্চশব্দের জন্য রহিতকারী হতে পারে না। কেননা \\\’নসখ\\\’ এর জন্য প্রথমে \\\’তাআরুয\\\’ তথা সাংঘর্ষিক হওয়া জরুরি। এরপর কোনটি আগের আর কোনটি পরের তা প্রমাণিত হওয়া জরুরি। উচ্চশব্দের রেওয়ায়েত আগের একথা প্রমাণিত, পরের নয়। সুতরাং তা অনুচ্চস্বরে আমীন বলার হাদীসের জন্য কীভাবে \\\’নাসেখ\\\’ তথা রহিতকারী হতে পারে?

ওদিকে অনুচ্চশব্দে আমীন বলার হাদীস আসল; কেননা আস্তে আমীন বলাই আসল ও প্রকৃত নিয়ম। যদি উচ্চশব্দে আমীন বলার হাদীস না থাকত তাহলে এর ওপরই আমল ওয়াজিব হত। যেহেতু উচ্চশব্দে আমীন বলার হাদীস আছে সেহেতু অনুচ্চশব্দে আমীন বলার হাদীসের ওপর আমল করা ওয়াজিব না হলেও কমপক্ষে উত্তম ও শ্রেয় তো হবেই।

এখন যদি কেউ প্রশ্ন তোলেন যে, যেভাবে সর্বদা উচ্চশব্দে আমীন বলা কিংবা রহিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। সুতরাং অনুচ্চশব্দে আমীন বলার হাদীস উচ্চশব্দে আমীন বলার হাদীসের জন্য রহিতকারী হয় কী করে? কেননা অনুচ্চশব্দে আমীন বলাও তো সর্বদার প্রমাণসিদ্ধ আমল নয় কিংবা সর্বশেষ আমল নয়।

এই প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, অনুচ্চশব্দের হাদীস উচ্চশব্দের হাদীসের জন্য রহিতকারী নয়, কথা ঠিক; কিন্তু অনুচ্চশব্দে আমীন বলা উত্তম – কোন সন্দেহে নেই। কেননা আমীন একটি দোয়া ও মোনাজাত, যা আল্লাহ তাআলার দরবারে পেশ করা হয়। আর আল্লাহ তাআলা (নাউযুবিল্লাহ) না বধির, না অনুপস্থিত-যেমনটি সহীহ বুখারীতে উল্লেখ রয়েছে। তাই দোয়া আস্তে করা উত্তম। আমীনও এক প্রকার দোয়া, কাজেই এটিও অনুচ্চশব্দে বলা শ্রেয়। আর উচ্চশব্দে বলা কেবল জায়েয।

এখন নিরপেক্ষভাবে কাউকে যদি বলা হয় যে, যারা আসলের উপর আমল করে তারা কি প্রকৃত হাদীসের অনুসারী, নাকি যারা সাময়িক শিক্ষণীয় উদ্দেশ্য বলা হাদীসের উপর আমল করে তারা?

শাইখুল হিন্দ (রহ)এর চ্যালেঞ্জিং ভাষ্য-

পাল্টা চ্যালেঞ্জ-২

আপনারা আমাদের কাছে অনুচ্চস্বরে \\\’আমীন\\\’ প্রসঙ্গে বিশুদ্ধ হাদীস, \\\’মুত্তাফাক আলাইহি\\\’ হাদীস তলব করছেন, তাতেও আবার (সরীহ) সুস্পষ্ট-পাঠ হওয়ার শর্ত জুড়ে দিয়েছেন- আমরাও আপনাদের কাছে \\\’সর্বদা উচ্চস্বরে\\\’ আমীন প্রসঙ্গে \\\’সহীত\\\’ \\\’সরীহ\\\’ (সুস্পষ্ট-পাঠ) হাদীস দাবি করছি। যদি দেখাতে পারেন তবে ১০ এর বদলে ২০ নিয়ে নিন, না পারলে কাউকে আর মুখ দেখাবেন না।

এতটুকুও যদি না পারেন তাহলে কমপক্ষে নবীজীর জীবনের \\\’সর্বশেষ নামাযের আমীনটি উচ্চস্বরে\\\’ ছিল বলে প্রমাণ দিন। ১০এর বদলে ২০টি রুপি নিয়ে নিন। না পারলে আপনারাই বলুন, সুন্নতের প্রকৃত অনুসারী কারা- আপনারা, না আমরা?

সত্যি বলতে কি, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর হাদীস উচ্চস্বরে আমীন, সর্বদা আমীনের ইঙ্গিতবহ নয়। প্রিয়নবী (সা.) সর্বশেষ নামাযটিতে আমীন উচ্চস্বরে বলেছেন- এমনও কোন প্রমাণ নেই। তাই উচ্চস্বরে আমীন বলা কিংবা রহিত হওয়া উভয় সম্ভাবনাই সমানভাবে থাকছে। এ জন্য উচ্চশব্দে আমীনসম্বলিত হাদীস ও অনুচ্চশব্দে আমীনসম্বলিত হাদীস পরস্পর বিরোধী নয় কাজেই উচ্চ-অনুচ্চ দুটি বিষয়ই এখানে নীরব থেকে যাচ্ছে। অতএব এর কোনটির প্রতিই আমল অবধারিত হতে পারছে না; তবে একটি না একটি অবশ্যই উত্তম হবে। অনুচ্চস্বরে আমীন বলার হাদীসসমূহ উচ্চস্বরে আমীন বলার হাদীসসমূহকে রহিত করতে না পারলেও শ্রেয় হওয়ার ব্যাপারে অবশ্যই ইঙ্গিতবহ।

বিশেষ করে যখন অপর একটি হাদীস বলছে-

\\\”তোমরা কোন বধির কিংবা অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছ না,

(যে তাঁকে উচ্চস্বরে ডাকতে হবে)।\\\”

এরূপ আরো দলিল যেগুলো দোয়া অনুচ্চস্বরে শ্রেয় হওয়ার উপর মোক্ষম দলিল। তাই হানাফীরাই হাদীসের প্রকৃত অনুসারী। আর আপনারা হাদীস অস্বীকারকারী।

শাইখুল হিন্দ (রহ.) যে হাদীসটির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন তার বিস্তারিত এই যে, হযরত আবু মূসা আশআরী (রা.) বলেন, আমরা রাসূলে আকরাম (সা.)এর সঙ্গে সফর করছিলাম। যখন আমরা কোন এক ময়দানে পৌঁছুতাম তখন \\\’লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার\\\’ বলতাম। এতে তোমাদের কণ্ঠ উচ্চকিত হত। এ মর্মে নবীজী ইরশাদ করেন-

\\\”হে লোকেরা! তোমরা নম্রতা অবলম্বন কর। তোমরা কোন বধির কিংবা অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছে না। কেননা তিনি তোমাদের সাথে আছেন। তিনি সর্বশ্রোতা ও নিকটবর্তী, বড়ই বরকতময় তাঁর নাম, অতি উচ্চে তাঁর মর্যাদা।\\\”

আল্লামা আইনী (রহ.) এ হাদীসের ব্যাখ্যায় লেখেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর এ কথা দ্বারা বোঝা যায়, জোরে যিকির ও দোয়া করা মাকরূহ।

আল্লামা খাত্তাবী (রহ.) বলেন-

\\\’নবীজীর উদ্দেশ্য হল তোমরা জোরে বলা থেকে বিরত থাক এবং থাম।\\\’ হাদীসটি উদ্দেশ্য এই নয় যে, দোয়া ও যিকির হালকা আওয়াজে কর, যেমনটি মেসবাহুল আদিল্লা-এর রচয়িতা বয়ান করেছেন।

তথ্য সূত্র

ফতোয়ায়ে শামী খ. ১ পৃ. ৩৯১, সুনানে সালাত অধ্যায়

আলমুগনী খ. ১. পৃ. ৫২৯

সহীহ বুখারী ৭৮০; মাআরিফুস সুনান খ. ২ পৃ. ৩৬৮

সহীহ বুখারী ৭৮২; সুনানে আবু দাউদ ৯৩২, ৯৩৩; জামে তিরমিযী ২৪৮, ২৪৯

হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজ্‌র (রা.) ইয়ামানের শাহজাদা ছিলেন। প্রথমবার যখন তিনি দরবারে নববীতে হাজির হন তখন নবীজী তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান, এমনকি তাঁর আগমনের আগেই নবীজী সাহাবায়ে কেরামকে এ সুসংবাদ দেন। তিনি কিছু দিন নবীজীর দরবারে থাকেন এবং দীনের জরুরি তালীম অর্জন করে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

ইবনে রাহুয়াহ তার \\\’মুসনাদ\\\’-এ বর্ণনা করেন- নাসবুর রায়াহ খ. ১ পৃ. ৩৭১

বিস্তারিত জানতে দেখুন-এলাউস সুনান খ. ২ পৃ. ২২২

এলাউস সুনান খ. ২ পৃ. ২২৩

এ রেওয়ায়েতগুলো\\\’এলাউস সুনান খ. ২ পৃ. ২১১ থেকে সংগৃহীত

কিতাবুল আসমা ওয়াল-কুনা খ. ১ পৃষ্ঠা ১৯৭-মাআরিফুস সুনান খ. ২ পৃ. ৪০৬

তবরানী কাবীর-মাজমাউয যাওয়ায়েদ খ. ২ পৃ. ১১৩

শরহুল মাওয়াহেব খ. ৭ পৃ. ১১৩-মাআরিফুস সুনান খ. ২ পৃ. ৪০৯

সুনানে নাসায়ী খ. ১ পৃ. ১৪৭

আল্লামা ইবনে হুমাম (রহ.) ফতহুল কাদীর-এ দুইজনের রেওয়ায়েতের মাঝে এ সমন্বয় সাধনই করেছেন খ. ১ পৃ. ১৫৭

সহীহ বুখারী, হাদীস ৭৩৮৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭০৪

সহীহ বুখারী, হাদীস ২৯৯২; জিহাদ অধ্যায়, কুতুবে সিত্তার অবশিষ্ট কিতাবেও রেওয়াতেটি রয়েছে।

ফেসবুকে যোগাযোগ

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s