ইমাম আবু হানিফা(রাহ)বনাম আহলে হাদিসঃ পর্ব-১

শুরু করলাম মহান আল্লাহ তাআলার নামে যার জন্য বরাদ্দ সমস্ত প্রশংসা, যিনি সমগ্র মাখলুকাতের রব এবং হাজার সালাম নাবী কারিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অয়াসাল্লাম) এর প্রতি যার আগমনে এ ধরায় মানুষ পেয়েছিল মুক্তির দিশা।প্রথমেই বলে নিই যে আমার কোন মুসলিম ভাই হোক যেকোন মাজহাবের অথবা লা-মাজহাব,হোক যে কোন দল বা মতের (তবে অবশ্যই শির্কমুক্ত) তার প্রতি আমার ভ্রাতৃত্ববোধ অটুট ও দ্বিধাহীন।
আমার এই লেখার তাড়না মূলত আহলে হাদিস’দের কিছু ভুল ধারনার প্রেক্ষিতে।কিছুদিন আগে আহলে হাদিস’দের তাওহীদ প্রকাশনী থেকে তাদের দুটি বই কিনলাম যেখানে হানাফি মাজহাবের অনেক মা’সালার ব্যাপারে তারা ভ্রান্তিবশত আপত্তি প্রকাশ করেছেন। আমার মনে হয় শুধুমাত্র বুখারি বা মুসলিম শরীফের হাদিসই আমলযোগ্য আর অন্য কোন হাদিস নয় এই ভুল ধারনার বশবর্তী হয়ে তারা বিভ্রান্তিকর মতবাদ দিচ্ছে।বস্তুত সিহাহ সিত্তার ছয়টি হাদিস গ্রন্থ ছাড়াও আরও বহু সহিহ হাদিস বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থতে লিপিবদ্ধ আছে।আবার একটি সহিহ হাদিস পাওয়া গেলে তার বিপরীতে পরবর্তী কোন সহিহ হাদিস বা কুরআনের আয়াত তা মানসূখ করে দেয় কিনা অথবা মানসূখ না হলে সেক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অয়াশাল্লাম) এর সর্বাধিক এবং শেষ জীবনের আমল কোনটা কিংবা সর্বাধিক সংখ্যক সাহাবীর আমল কোনটা, কোন হাদিস কোন প্রেক্ষিতে বলা হয়েছে ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের উপর ইজতেহাদ করে সবচাইতে সঠিক মা’সালা নির্নয় করার মেধা যে সবার নেই এবং এ কাজে যে ইতিহাসখ্যাত চার ইমামের যোগ্যতাই সবচেয়ে বেশি এ ব্যাপারে ইতিহাস এর সব যুগের সব মানুষই একমত। এখন আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান দিয়ে হানাফি মাজহাবের বিভিন্ন মা’সালার উপর আহলে হাদিস’দের বিরুদ্ধ মতগুলো খন্ডানোর চেস্টা করব ইনশাল্লাহ। এজন্য আল্লাহ তাআলার সাহায্য কামনা করছি।
১।ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পড়া =>
পড়ার দলীল – আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্নিত, তিনি বলেন, ‘নাবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অয়াসাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি সলাতের মধ্যে সূরা ফাতিহা পড়ল না তার সলাত বাতিল,বাতিল,বাতিল।“অতঃপর আবু হুরায়রাকে জিজ্ঞাসা করা হল যে, আমরা যখন ইমামের পিছনে সলাত পড়বো? তিনি বললেন, তখনো তোমরা তা মনে মনে পাঠ করবে।‘[মুসলিম; অনুরূপ বহু হাদিস বর্নিত আছে বুখারি,তিরমিজি,নাসাই এবং মিশকাত শরীফে]
না পড়ার দলীল – [একটি দীর্ঘ হাদিসের অংশ বিশেষ] আবু মুসা আশআ’রি (রা) হতে বর্নিত, ‘………নাবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অয়াসাল্লাম) আমাদের সলাত পড়া শিক্ষা দিয়েছেন।তিনি বলেন, তোমারা যখন সলাত পড়বে তখন তোমাদের কাতারগুলো সোজা করে নাও।তারপর তোমাদের মধ্যে একজনকে ইমাম নিযুক্ত কর।সে যখন তাকবীর বলবে তোমরাও তাকবীর বলবে……।’ কাতাদা থেকে এই সূত্রেও একই হাদিস বর্নিত হয়েছে। জারীর সুলাইমানের সূত্রে কাতাদার এই হাদিস বর্ননা করেন। এই বর্ননায় আরও আছে ‘ইমাম যখন সূরা পাঠ করে তোমরা তখন চুপ থাক’। আবু ইসহাক বলেন আবু নদরের বোনের ছেলে আবু বকর বলেন, এই হাদিসটি একবার আলোচিত হলে ইমাম মুসলিম বলেন, সুলাইমানের এই বর্ননা সম্পূর্ন সহিহ।আবু বকর বললেন আবু হুরায়রার বর্ননা(আবু হুরায়রা থেকে বর্নিত একই হাদিস)সম্পর্কে আপনার কি মত? তিনি বললেন তার বর্ননাও সহিহ অর্থাৎ ইমাম যখন সূরা পাঠ করে তোমরা তখন চুপ থাক।[মুসলিমঃকিতাবুস সলাত অধ্যায়-৭৯৯/৮০০ নং হাদিসঃবাংলাদেশ ইসলামিক সেনটার কতৃক অনুদিত]
হযরত আ’তা ইবনে ইয়াশার (রা) থেকে বর্নিত যে তিনি যাইদ ইবনে সাবিত (রা) কে ইমামের পিছনে কিরাত পড়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, “কোন সলাতেই মহান কুরআন থেকে ইমামের পিছনে কোন তিলাওয়াত নেই”।[সহিহ মুসলিমঃ সুজুদ-উত-তিলওয়াত অধ্যায়]
আবু নুয়াঅম ওহব ইবনে কায়সন(রহ) হতে বর্নিত- তিনি জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যাক্তি এমন এক রাকাত নামাজ পড়েছে যে তাতে সূরা ফাতিহা পড়ে নাই তার নামাজ হয় নাই,অবশ্য সেই ব্যাক্তি যদি ইমামের পেছনে (নামাজ পড়ে) থাকে(তাহলে নামাজ শুদ্ধ হয়েছে)”। [মুয়াত্তা মালিকঃনামাজ অধ্যায়-রেওয়াত ৩৮-ইসলামিক ফাউন্ডেশন]
নাফি(রহ) হতে বর্নিত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) কে প্রশ্ন করা হত ইমামের পিছনে কেউ কুরআন পাঠ করবে কি? তিনি বলতেন “তোমাদের মধ্যে কেউ যখন ইমামের পিছনে নামাজ আদায় করবে তখন ইমামের কিরাতই তার জন্য যথেষট, আর যখন একাকি নামাজ আদায় করবে তখন তোমরা কুরআন পাঠ করবে” [মুয়াত্তা মালিকঃনামাজ অধ্যায়-রেওয়াত ৪৩-ইসলামিক ফাউন্দেশন]
জারূদ ইবনে মূআজ তিরমিজি(রাহ)…আবু হুরায়রা(রা) হতে বর্নিত। তিনি বলেন, “নাবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অয়াসাল্লাম) বলেছেন ইমাম নিযুক্ত করা হয়েছে তাঁর অনুসরণ করার জন্য। অতএব যখন সে তাকবির পড়ে তোমারাও তখন তাকবীর পড় আর যখন সে কুরআন পড়বে তখন তোমরা চুপ থাকবে, যখন তিনি বলেন ‘সামিআল্লাহ হুলেমান হামিদাহ’, তখন তোমরা বলবে ‘রাব্বানা লাকাল হামদ’।[সুনানে নাসাইঃ৯২৪, “আল্লাহ তাআলা’র বানীঃ যখন কুরআন পাঠ করা হয় তখন তোমরা চুপ থাক এবং মনযোগ সহকারে শুন, আশা করা যায় তোমরা রাহমাত প্রাপ্ত হবে আয়াতের ব্যাখ্যা” অধ্যায়; ইসলামিক ফাউন্ডেশন]
অনেক সময় কুরআন এবং হাদিসের ক্ষেত্রে আ’ম এবং খাস এ দু’রকম বর্ননা আসে। আ’ম/মুত্বলাক হল ঐ বিষয় যাকে কোন ধরনের শর্ত ছাড়া ব্যাপকভাবে উল্লেখ করা হয়। মুখাসসিশ/মুকায়্যিদ/খাস হল ঐ বিষয় যার দ্বারা ব্যাপকভাবে উল্লেখিত বিষয়সমূহকে শর্তযুক্ত করা হয়। তাহলে কোন বিষয়ের মুকায়্যিদকে গ্রহণ করা বেশী উত্তম না মুত্বলাক তা আমরা নিজেরাই সাধারণ বুদ্ধিতে বুঝতে পারি। নাবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অয়াশাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি সলাতের মধ্যে সূরা ফাতিহা পড়ল না তার সলাত বাতিল,বাতিল,বাতিল”। এই হাদিস অবশ্যই সকল নামাজী হোক সে ইমাম,মুক্তাদি বা একাকি আদায়কারী সকলের জন্য প্রযোজ্য, অর্থাৎ আ’ম। কিন্তু যখন কুরআনের উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয় তখন কেবল একাকি আদায়কারীর জন্য তা খাস হয়ে যায়, এ আয়াতের ব্যাখ্যাকারক উপরোক্ত হাদিসটি থেকে তাই বুঝা যায়।
অনুরূপ বহু হাদিস সহিহ সনদে বর্নিত আছে তিরমিজি,আবু দাউদ,বায়হাকি,আসারউস সুনান এবং ইবনে মাজাহ শরীফে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “যখন কুরআন পাঠ করা হয় তখন তোমরা চুপ থাক এবং মনযোগ সহকারে শুন, আশা করা যায় তোমরা রাহমাত প্রাপ্ত হবে”।[সূরা আরাফঃ ২০৪] হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ,আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস,আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল, আবু হুরায়রা (রা) এর মতে এই আয়াত নাজিল হয় জুমা’র খুতবা এবং সলাতের ব্যাপারে [তাফসীর ইবনে কাসির]। এ আয়াতের মাধ্যমে নামাযে নীরবে কিরআত শুনা ওয়াজিব হয়ে যায়। এভবে বহু সংখ্যক দলিলের মাধ্যমে ইমাম আবু হানিফা (রহ) এই মত দেন যে প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য কোন নামাজে ইমামের পিছনে কোন সূরা পড়ার দরকার নেই।
এক আহলে হাদিস তার বইতে রায় দিলেন যে যেহেতু সূরা ফাতিহা ছাড়া নামাজ বাতিল(দেখুন পড়ার দলীল এ) সেহেতু হানাফি মাজহাবের সমশ্ত লোকের যারা ইমামের পেছনে সূরা পড়েন না তাদের এতদিনকার সকল নামাজ বাতিল(দেখুন ইঞ্জিনিয়ার শামসুদ্দিন আহমেদ এর বই-সূরা ফাতিহা না পড়লে মুক্তাদির নামাজ হবে না)!!তাওহিদ প্রকাশনীর বুখারি শরিফেও একই কথা বলা আছে। কিন্তু উপরের দলিলগুলো যে অন্য কথা বলে। লেখক (ইঞ্জিনিয়ার শামসুদ্দিন আহমেদ) এখানে দারুন বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিলেন। পাঠক লক্ষ্য করলে দেখবেন যে উপরের হাদিসগুলোয় সরাসরি সূরা ফাতিহার কথা না বলে কুরআন পড়া বা কিরাত পড়া যাবে না বলে মত এসেছে। হাদিসগুলো শতভাগ সহিহ। যেহেতু কোন অজুহাতে হাদিসগুলো অশ্বীকার করা যাবে না তাই লেখক বুদ্ধি করে সূরা ফাতিহাকেই কুরআন(বা কিরাত) থেকে বের করে দিলেন!! বিভিন্ন হাদিসের হাস্যকর ব্যাখ্যা এবং কুরআন কারিমের “হে রাসূল আমি আপনাকে দান করেছি এমন সাতটি আয়াত যা বারবার পড়া হয় এবং মহান কুরআন”[সূরা হিজরঃ ৮৭] এ আয়াতের ‘এবং’ শব্দ দিয়ে তিনি প্রমান করার চেষ্টা করেন যে সূরা ফাতিহা এবং কুরআন শরীফ ভিন্ন!!!! তাই ‘কুরআন পড়া’ বা ‘কিরাত পড়া’ যাবে না বলতে সূরা ফাতিহা পড়া যাবে না বুঝায় নাই বরং বুঝিয়েছে অন্য কোন সূরা পড়া যাবে না কিন্তু সূরা ফাতিহা অবশ্যই পড়তে হবে। কুরআনের বহু আয়াত বা বহু হাদিসের আলোকে বলা যায় যে সূরা ফাতিহা পবিত্র কুরআনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় তা আর করলাম না, করার প্রয়োজনও বোধ করছি না। শুধু দুটি পরিষ্কার হাদিস এ ব্যাপারে উল্লেখ করছিঃ
মুহাম্মদ ইবনে কুদামা…ইবনে আব্বাস(রা) হতে বর্নিত। তিনি বলেন “নাবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অয়াশাল্লাম) কে দান করা কুরআন মাজিদের সাতটি বড় সূরা। তিনি এ হাদিসে ‘সাব’আম মিনাল মাছানি’ (এমন সাতটি আয়াত যা বারবার পড়া হয়) বলতে সাতটি বড় সূরার কথা বুজিয়েছেন”।[সুনানে নাসাঈঃ ৯১৮, “আল্লাহ তায়ালার বানীঃহে রাসূল আমি আপনাকে দান করেছি এমন সাতটি আয়াত যা বারবার পড়া হয় এবং মহান কুরআন” অধ্যায়; ইসলামিক ফাউন্ডেশন]
হুছাইন ইবনে হুরায়ছ(রাহ)……উবাই ইবনে কা’ব(রা) থেকে বর্নিত। তিনি বলেন, “নাবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অয়াসল্লাম) বলেছেন আল্লাহ তাআলা সূরা ফাতিহার মত তাওরাত বা ইঞ্জিলে কোন আয়াত নাজিল করেন নি। তা সাত আয়াত যা বারবার পড়া হয়ে থাকে।”।[সুনানে নাসাঈঃ ৯১৭, “আল্লাহ তায়ালার বানীঃহে রাসূল আমি আপনাকে দান করেছি এমন সাতটি আয়াত যা বারবার পড়া হয় এবং মহান কুরআন” অধ্যায়; ইসলামিক ফাউন্ডেশন]
মহান কুরআনুল কারিম শুধু এক অপূর্ব ছন্দবদ্ধ রচনাই নয়, বরং এক বিস্ময়কর ও জটিল গানিতিক বুননে গ্রন্থিত এক ঐশীবাণী [এ প্রসঙ্গে শাইখ আহমেদ দিদাতের অসাধারণ বই ‘উনিশের বেড়াজালে কুরআন’ দেখতে পারেন]। এর একটি মাত্র বর্ন আগে-পরে হলে এই সুন্দর গানিতিক বিন্যা্স ভেঙে যাবে, সেখানে লেখক পুরো একটি সূরাকেই বাদ দিয়ে দিলেন। আল্লাহ তা’আলাই ভাল জানেন।
২। কোথায় হাত বাঁধতে হবে =>
হানাফি মাজহাবের উপর আহলে হাদিসের নিরবিচ্ছিন্ন আক্রমনের আরেকটি দিক হল সলাতে কোথায় হাত বাঁধতে হবে তা নিয়ে। তাওহিদ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বুখারি শরীফের ১ম খণ্ডে সলাতে হাত বাধা সম্পর্কিত একটি হাদিসের টীকায় তারা বুকের উপর হাত বাধা সম্পর্কে বিভিন্ন হাদিসের এক বিশাল বর্ননা দেয় এবং নাভির নিচে হাত বাধার হাদিসটি যে দুর্বল(যার উপর হানাফিরা আমল করে) সে ব্যাপারে তারা নিঃসন্দেহ বলে জানায়।
সলাতের মধ্যে নাভির নিচে হাত স্থাপন বিষয়ে আল আলবানি(রহ) তার ‘সিফাহ সালাহ আন নববি’ বইতে এই বিষয়ে যে সমস্ত হাদীস তার কাছে পৌঁছেছে সেগুলোকে যঈফ ঘোষণা করেছেন রাবি আব্দার-রহমান ইবন আল ইশহাক অয়াসিতি আল কুফির উপস্থিতির কারনে। এটা সত্য, কারণ মুহাদ্দিসদের মতে ইনি একজন দুর্বল রাবি। একই রকম কথা বলা হয় তাওহিদ প্রকাশনী’র বুখারি শরিফেও। কিন্তু অন্যান্য অনেক হাদিস যেখানে নাভির নিচে হাত স্থাপন করতে বলা হয়েছে সেগুলো এই দুই বইয়ের কোথাও উল্লেখ করা হয় নি। আলবানি(রহ) ইবনে জারীর আল দাব্বি’র সূত্রে বর্ননা করেন, ইবনে জারীর তার পিতা হতে বলেন ‘আমি আলী(রা) কে দেখেছি তিনি তার ডান হাত বাম হাতের উপর স্থাপন করে নাভির উপর বাধতেন (লক্ষ্য করুন নাভির উপর কিন্তু বুকে নয়)।বায়হাকি হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।ইমাম শাফেই,নববি,মুসলিম,বায়হাকি(রাহ) প্রমুখ নাভির উপর (বুকে নয়) হাত বাধাকেই পছন্দ করেছেন। আলবানি(রহ) দাবি করেছেন এই হাদিসটি বুখারি শরিফেও আছে।এবং তাওহিদ প্রকাশনী’র বুখারি শরিফে এ সম্পর্কিত হাদিসের টীকায়(পৃষঠা ৩৫৬) ওয়াইল ইবনে হুজর (রা) এর সূত্রে বর্ননা করা হয়, “আমি নাবী কারিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অয়াশাল্লাম) এর সাথে সলাত আদায় করেছি। আমি দেখেছি তিনি স্বীয় ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকের উপর হাত বাধলেন [বুখারি,মুসলিম,সহিহ ইবনু খুজায়মা, আবু দাউদ,তিরমিজি,ইবনে মাজাহ]। তাদের কথা অনুযায়ী আমি বুখারি,মুসলিম,তিরমিজি শরীফে হাদিসগুলো দেখলাম কিন্তু কোথাও বুকের উপর কথাটি দেখলাম না। হাদিসগুলো হুবহু তুলে ধরলাম –
সাহল ইবনু সা’দ (রা) হতে বর্নিত,“তিনি বলেন লোকেদের নির্দেশ দেওয়া হত যে, প্রত্যেক সলাতে ডান হাত বাম হাতের কব্জির উপর রাখবে”।[বুখারিঃ৭০৪,মুয়াত্তা অধ্যায় ৯-রেওয়াত ৪৬,৪৭; ইসলামিক ফাউন্দেশন]
অয়াইল ইবনে হুজর(রা) থেকে বর্নিত, “তিনি নাবী কারিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অয়াশাল্লাম) কে দেখলেন, তিনি সলাতে প্রবেশ করার সময় দু হাত তুললেন এবং তাকবীর বললেন।হাম্মামের বর্ননায় আছে, তিনি দু’হাত কান পর্জন্ত উঠালেন; তারপর চাদরে ঢেকে নিলেন এবং বাম হাত ডান হাতের নিচে রাখলেন”।[মুসলিমঃ ৭৯১- ইসলামিক ফাউন্দেশন]
মুহাম্মদ ইবনে বাককার…ইবনে মাসউদ(রা) থেকে বর্নিতঃ তিনি ডান হাতের উপর বাম হাত রেখে পড়ছিলেন। নাবী কারিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অয়াশাল্লাম) তা দেখে বাম হাতের উপর ডান হাত রেখে দেন(সহিহ)।[আবু দাউদঃ ৭৫৫; ইসলামিক ফাউন্দেশন]
ওয়াইল ইবনে হুজর (রা) এর সূত্রে বর্ননা করা হয়, “আমি নাবী কারিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অয়াশাল্লাম) কে সলাত আদায় করতে দেখেছি এবং তিনি স্বীয় ডান হাতকে বাম হাতের উপর ধরে রাখলেন(সহিহ)।[ইবনে মাজাহঃ ৮১০,দারুস সালাম প্রকাশনী, ইংরেজি ভার্সন]

ওয়াইল ইবনে হুজর (রা) এর সূত্রে বর্ননা করা হয়, “আমি নাবী কারিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অয়াশাল্লাম) এর সাথে সলাত আদায় করেছি। আমি দেখেছি তিনি স্বীয় ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকের উপর হাত বাধলেন”।[ইবনে খুজায়মাঃ ৪৭৯]
ইমাম নিমাওই বলেন এর ইসনাদ প্রশ্নবিদ্ধ এবং অতিরিক্ত শব্দ ‘বুকের উপর’ ভিত্তিহীন এবং প্রতিষঠিত নয়।
কুতায়বা(রাহ)…কাবিসা ইবনে হুলব তার পিতা হুলব(রা) থেকে বর্ননা করেনঃ তিনি বলেন “নাবী কারিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অয়াশাল্লাম) যখন আমাদের ইমামতি করতেন তখন ডান হাত দিয়ে তার বাম হাত ধারন করতেন”।
তিরমিজি হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।এরপর তিনি বলেন, সাহাবি, তাবেই ও পরবর্তী যুগের আলেমগণ এই হাদিসের উপরই আমল করেছেন। তারা সলাতে বাম হাতের উপর ডান হাত রাখার অভিমত ব্যাক্ত করেছেন।কেউ কেউ নাভির উপর হাত স্থাপন করার আর কেউ কেউ নাভির নিচে হাত স্থাপন করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে আলিমগনের নিকট উভয় সুরতেরই অবকাশ আছে।[তিরমিজিঃ ২৫২- ইসলামিক ফাউন্দেশন]
ইমাম তিরমিজির এই গুরুত্বপুর্ন আলোচনা তারা কেউই উল্লেখ করেন নি।
উপরের হাদিসগুলো থেকে বুঝা যায় যে ‘বুকের উপর হাত বাধলেন’ কথাটি সিহাহ সিত্তাহ’র হাদিসগুলোর উপরে আহলে হাদিসদের অতিরিক্ত যোগ করা, অথচ এটাকে তারা ওয়াজিব সাব্যশ্ত করতে চায়। প্রকৃতপক্ষে আবু দাউদ ব্যাতিত বুখারি, মুসলিম, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, তিরমিজি কোথাও সুনির্দিষটভাবে কোথায় হাত বাধতে হবে সে ব্যাপারে বলা নেই (অথবা আমার দৃষটিশক্তির সমস্যা থাকতে পারে। কেউ পেলে দয়া করে জানাবেন)।
তাহলে সুনির্দিষট করে হাত বাধার কথা কোথায় আছে? এবার আবু দাউদ শরীফের কিছু হাদিস বর্ননা করছি যেখান থেকে সব কিছু পরিস্কার হবে বলে আশা করি।
আবু তাউবা…তাউস (রাহ) হতে বর্নিত। তিনি বলেন “নাবী কারিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অয়াশাল্লাম) সলাতরত অবস্তায় ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকের উপর হাত বাধতেন”।[আবু দাউদঃ ৭৫৯- ইসলামিক ফাউন্দেশন]
আহলে হাদিস’রা এই হাদিসের উপর আমল করে তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু তারা হানাফিদের নাভির নিচে হাত বাধাকে ভিত্তিহীন বলতে চায় বায়হাকি শরীফ এবং আবু দাউদ শরীফের নাভির নিচে হাত বাধার হাদিসগুলোকে দুর্বল উল্লেখ করে। আবু দাউদ শরীফের হাদিসটি হলঃ
মুসাদ্দাদ -> আব্দুল অয়াহিদ ইবনে জিয়াদ -> আব্দার-রহমান ইবন আল ইশহাক অয়াসিতি আল কুফি -> হাকাম -> আবু অয়ায়েল থেকে বর্নিত। তিনি বলেন, আবু হুরায়রা(রা) বলেছেন- আমি নামাজে নাভির নিচে (বাম) হাতের উপর (ডান) হাত রাখি।[আবু দাউদঃ ৭৫৮- ইসলামিক ফাউন্দেশন]
আবু দাউদ(রাহ) বলেছেন, আমি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রাহ) কে আব্দার-রহমান ইবন আল ইশহাক অয়াসিতি আল কুফি কে দুর্বল রাবি হিসেবে উল্লেখ করতে শুনেছি।
আলবানিও অয়াসিতি আল কুফি কে দুর্বল উল্লেখ করে হাদিসটি জঈফ বলেছেন। অতএব হাদিসটি দুর্বল সন্দেহ নেই।
অথচ তাওহীদ প্রকাশনী এবং আলবানি(রাহ) উভয়েই এর ঠিক আগের দু’টি সহিহ হাদিস বেমালুম চেপে গেছেন অথবা তাদের চোখে পড়েনি।
মুহাম্মদ ইবনে কুদামা…ইবনে জুরাইজ থেকে তার পিতার সূত্রে বর্নিত। তিনি বলেন আমি আলী(রা) কে নামাজে নাভির উপর ডান হাত দিয়ে বাম হাত ধরে রাখতে দেখেছি।
ইমাম আবু দাউদ(রাহ) বলেন সাইদ ইবনে জুবাইর থেকে ‘নাভির উপর’ বর্নিত আছে। আর আবু মিজলাজ বলেন ‘নাভির নিচে’। আবু হুরায়রা(রা) থেকেও অনুরূপ বর্নিত আছে, কিন্তু তা তেমন শক্তিশালী নয়।[আবু দাউদঃ ৭৫৭- ইসলামিক ফাউন্দেশন]
মুহাম্মদ ইবনে মাহবুব……আবু জুহাইফা(রা) হতে বর্নিত। আলী(রা) বলেন সলাতরত অবসথায় নাভির নিচে বাম হাতের তালুর উপর ডান হাতের তালু রাখা সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত।[আবু দাউদঃ ৭৫৬- ইসলামিক ফাউন্দেশন]
উপরোক্ত হাদিসটি আনাস(রা) থেকেও বর্নিত আছে।
আলবানি(রাহ) তার বইতে এবং তাওহিদ প্রকাশনী’র বুখারি শরীফে লেখা হয়েছে যে, ইমাম ইসহাক ইবনে রাওইয়াহ(রাহ) (বুখারি (রাহ) এর অন্যতম শিক্ষক) এই সুন্নাতের উপর(বুকের উপর হাত বাধা) আমল করতেন, যেমন মারওয়াজি তার ‘মাসাইল’ এ বলেছেন, “ইসহাক আমাদের নিয়ে বিতর পড়তেন, তিনি কুনুতে হাত উঠাতেন, রুকুর পুর্বে কুনুত পড়তেন এবং বুকের উপর বা বুকের সামান্য নিচে হাত বাধতেন”।
অথচ শামস-আল-আজিমাবাদি তার আওন আল মা’বুদ এ লিখেছেন ইমাম ইসহাক ইবনে রাওইয়াহ এবং আবু ইসহাক আল মারওয়াজি উভয়েই সলাতে নাভির নিচে হাত বাধতেন! অয়াহিদ উয যামান(পাকিস্তানের প্রয়াত সালাফি ইমাম) তার ‘সহিহ মুসলিম শরীফ – মুখতাসার শরাহ নববি’তেও একথা নিশ্চিত করেছেন যে, ইমাম সুফিয়ান সাওরি,ইমাম আবু হানিফা,ইমাম ইসহাক ইবনে রাওইয়াহ, আবু ইসহাক আল মারওয়াজি (রাহ) সবাই নাভির নিচেই হাত বাধতেন! তাহলে কার কথা বিশ্বাসযোগ্য?
নাভির নিচে, উপরে এবং বুকে হাত বাধার হাদিস এসেছে। এ ক্ষেত্রে নিজেরটা ছাড়া অপরের আমলকে বি’দাত বলা অত্যন্ত নিন্দনীয়, যেটা অনেক সালাফি প্রায়ই করে থাকে।
ইনশাল্লাহ পরবর্তী পোস্টগুলোতে অন্যান্য মা’সালার উপর আলোচনা করব। যেকোন ভুল-ভ্রান্তির জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা চাই।
নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলাই সবচাইতে ভাল জানেন।

মিম মিফতাহ

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s