আহলে-হাদীস ও মাযহাব নিয়ে কিছু কথা।

আহলে হাদীসের বাস্তবতা ও মাযহাবের
প্রযোজনিয়তা
রাসূল সা. এর তেইশ বছর নববী জীবনের
প্রতিটি বাণী এবং দৈনন্দিন জীবনের
প্রতিটি আচরণ-উচ্চারণ ও উঠা-
বসাকে বিশুদ্ধভাবে সংরক্ষণ
করা এবং হাদীসে নববীকে মিথ্যাচারীদের
বানানো অনুপ্রবেশ ও অগ্রহণীয় অনির্ভরযোগ্য
বর্ণনাকারীদের ভুল-ভ্রান্তি থেকে মুক্ত
করে উম্মতের নিকট পৌঁছে দেয়ার মহান ও গুরু
দায়িত্ব যে উলামায়ে উম্মত আঞ্জাম
দিয়েছেন তাদের “আহলে হাদীস ”
বা আসহাবুল হাদীস বলা হয়।
ইসলামের বিগত চৌদ্দশত বছরের
ইতিহাসে বর্তমান আহলে হাদীস সম্প্রদায়ের
কোন অস্তিত্ব পৃথিবীর বুকে ছিল না ।

উপমহাদেশে বৃটিশ শাসনামলে মুসলমানদের
মাঝে বিভ্রান্তি ও মতপার্থক্য
সৃষ্টি করে তাদের ধর্মীয় ও
জিহাদী চেতনাকে বিলুপ্ত করার কুটিল ষড়যন্ত্র
বাস্তবায়নের জন্য বৃটিশ সরকারের প্রত্যক্ষ
সহযোগিতায় তথাকথিত আহলে হাদীস
সম্প্রদায়ের জন্ম হয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার
হলো, এই সম্প্রদায়টি ইংরেজদের নিকট দরখাস্ত
প্রদান করে এই আহলে হাদীস খেতাবটি অর্জন
করে। স্বভাবতই এ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এদের
আহলে হাদীস হওয়ার পিছনে হাদীসের কোন
সম্পর্ক নেই। এখানে আহলে হাদীসের সূচনা ও
এই উপাধি গ্রহণ সম্পর্কে জনাব মুহাম্মদ হুসাইন
বটালবীর ঐতিহাসিক দরখাস্তটি উল্লেখ
করছি যা ইংরেজ সরকার বাহাদুর বরাবর
তিনি পাঠিয়েছিলেন। এ থেকেই স্পষ্ট
হয়ে যায় যে, ইতিহাসের কোন অংশ
থেকে তাদের অস্তিত্বের সূচনা হয়।
“আমি (মুহাম্মদ হুসাইন বটালবী) এ
বিষয়ে একটি কপি লিখিত আবেদনের
মাধ্যমে পাঞ্জাব গভর্নমেন্টের বরাবর পেশ
করছি এবং দরখাস্ত করছি যে, গভর্নমেন্ট যেন এ
প্রতিবেদনের প্রতি লক্ষ্য করেন এবং ইন্ডিয়ান
গভর্নমেন্টকে এর প্রতি লক্ষ করতে উৎসাহিত
করেন। এ দলটির
ব্যাপারে ওহাবী শব্দটি সরকারী চিঠিপত্রে
ব্যবহার করা বন্ধ করে তাদেরকে আহলে হাদীস
নামেই যেন সম্বোধন করা হয়। তাই পাঞ্জাবের
(সাবেক) লেফটেনেন্ট গভর্ণর আনারবেল স্যার
চার্লস এচিনের সাহেব যেন গভর্নমেন্টের
দৃষ্টি এ দরখাস্তের প্রতি আকৃষ্ট কারে হিন্দুস্তান
গভর্নমেন্টের অনুমতি ক্রমে দরখাস্তটি মুঞ্জুর
করেন এবং তিনি যেন ওহাবী শব্দটির
বিরোধিতা এবং আহলে হাদীস নাম চালুকরার
হুকুম পাঞ্জাবে জারী করেন।”
আপনাদের একান্ত বাধ্যগত খাদেম
আবু সাঈদ মুহাম্ম দ হুসাইন
সম্পাদক ইশায়াতুস সুন্নাহ
বৃটিশ সরকার এ আহলে হাদীস
নামধারী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন
সহযোগিতা এবং বিশেষ বিশেষ
ক্ষেত্রে তাদের সৌহার্দ মূলক আচরণের
বিনিময়ে মুহাম্মদ হুসাইন সাহেবের
দেয়া দরখাস্তটি বিনা বাক্যব্যয়ে গ্রহণ
করে নেয়। পাঞ্জাব সরকার সর্বপ্রথম ৩/১২/১৮৮৬
ইং তারিখে দরখাস্তটি মুঞ্জুুর করেন।
পর্যায়ক্রমে অন্যান্য প্রাদেশিক সরকারও এই
স্বীকৃতি প্রদান করেন।
মুক্তিপ্রাপ্ত দলের নতুন সংজ্ঞা
রাসূল সা. ইরশাদ করেন পূর্ববর্তী বনী ইসরাঈল
বাহাত্তুর দলে বিভক্ত হয়েছে আর আমার উম্মত
তেহাত্তুর দলে বিভক্ত হবে। একটি দল ব্যতীত
তাদের সকলেই জাহান্নামী।
সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন,
ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেই দল কোনটি?
তিনি বললেন, আমি ও আমার
সাহাবারা যে পথের উপর প্রতিষ্ঠিত (তার
অনুসরণকারী দল) অন্য হাদীসে এরশাদ করেন,
আমার পরে যারা আসবে তারা বহু ইখতিলাফের
সম্মুখীন হবে। তখন তোমাদের করণীয় হল, আমার
ও হেদায়াত প্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের
সুন্নতকে আঁকড়ে ধরা। তোমরা দীনের মধ্যে নব
উদ্ভাবিত বিষয় থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ
সকল নতুন জিনিস বিদ‘আত। আর বিদ‘আত হল
গোমরাহী। ( আবু দাউদ, মুসনাদে আহমদ)।
এ উভয় হাদীসের ভিত্তিতে মুক্তি প্রাপ্ত
দলকে সাহাবাদের যুগ থেকে “আহলুস্সুন্নাহ
ওয়াল জামাত” নাম দেওয়া হয়েছে। কারণ
মুক্তিপ্রাপ্ত দলের লোকেরা ইখতিলাফের সময়
সুন্নতে রাসূলকে আঁকড়ে ধরে জামাতে সাহাবা
এবং সর্বযুগে তাদের অনুসারী হক
পন্থী জামাতের সাথে থাকবে। হযরত
ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও ইবনে সীরীন (রহঃ)
থেকেও এই বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়।
তাহলে বুঝা গেল হাদীসে রাসূলের
আলোকে সাহাবা, তাবেয়ীন
এবং সর্বযুগে মুক্তিপ্রাপ্ত দলের
মহামণীষীরা এ দলকে আহলুস্সুন্নাহ ওয়াল
জামাত হিসাবেই চিনেছিলেন। কিন্তু
লামাযহাবী সম্প্রদায়টি মুক্তিপ্রাপ্ত দলের
ব্যাপারে সর্বযুগে ঐক্যমত্যে গৃহীত নাম বাদ
দিয়ে এই দলের নাম দিয়েছে “ আহলে হাদীস”
এবং দাবী করেছে যে, তারাই একমাত্র
মুক্তিপ্রাপ্ত দল।
হাদীসে রাসূল সা. অস্বীকারের
একটি লোমহর্ষক চিত্র
উল্লেখিত হাদীসে রাসূল সা.
কঠোরভাবে উম্মাতকে সতর্ক করেছেন যে,
তোমরা খুলাফায়ে রাশেদীনের মত ও
পথকে আঁকড়ে ধরবে। কারণ এ মত ও পথ ব্যতীত সব
বিদ‘আত ও গোমরাহী। বলাবাহুল্য রাসূলের সুন্নত
ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নতের বাইরেই হল
বিদ‘আতের অবস্থান এবং উভয়টির সম্পর্ক একদম
বিরীতমুখী। কিন্তু আবিস্কৃত এ
দলটি খুলাফায়ে রাশেদীনের
সুন্নাতকে অস্বীকার
করে সেগুলোকে বিদ‘আত বলে প্রচার
করেছে। বহু হাদীস ও সাহাবাদের আমলের
মাধ্যমে তারাবীহর নামাজ বিশ রাকাত
প্রমানিত হওয়ার পরও তারা বলে তারাবীহ বিশ
রাকাত পড়া ওমরের বিদ‘আত। তাদের এ উক্তির
জবাবে আমরা শুধু শাইখুল ইসলাম ইমাম
ইবনে তাইমিয়ার বক্তব্য উদ্ধৃত করছি “তারাবীহর
নামাজ বিদ‘আত নয়, বরং রাসূল সা. এর কথা ও
কাজের মাধ্যমে তা প্রমাণিত সুন্নত । কারণ
তিনি ইরশাদ করেন“ আল্লাহ তোমাদের উপর
রমযানের রোযা ফরয করেছেন আর
আমি রমযানের রাতে তারাবীহ পড়া সুন্নত
করেছি” অনুরুপভাবে জামাতের
সাথে তারাবীহ পড়াও বিদ‘আত নয়, বরং সুন্নত ।
কারণ রাসূল সা. রমযানের প্রথমভাগে দুই দিন
অথবা তিনদিন জামাতের সাথে তারাবীহ
পড়েছেন। (হযরত ওমর (রাঃ) এর উক্তি এ
তো উত্তম বিদ‘আত) এর ব্যাখ্যা হল,
এখানে তিনি তারাবীহর নামাজ জামাতের
সাথে পড়ার সৌন্দর্য প্রকাশ
করতে গিয়ে শাব্দিক অর্থের
বর্ণনা দিতে বিদ‘আত বলেছেন । শরীয়তের
পারিভাষিক বিদ‘আত নয়। কারণ আভিধানিক
অর্থে বিদ‘আত বলতে প্রত্যেক নব উদ্ভাবিত
বিষয়কে বুঝায়। (ইকতিযাউস সিরাতিল
মুনস্তাকিম ২ ৫৮৮-৫৮৯)
তেমনিভাবে তারা বলে, এক বৈঠকে তিন
তালাক পতিত হওয়া ওমরের বিদ‘আত , জুমার প্রথম
আযান উসমানের বিদ‘আত
ইত্যাদি (নাউযুবিল্লাহ)
তাদের কাছে আমাদের প্রশ্ন, হযরত ওমর (রা.)
হযরত উসমান (রা.)
কি খুলাফায়ে রাশেদা ছিলেন না? তাদের মত
ও পথকে রাসূল সা. সুন্নাত কলেছেন
তাকে আপনারা বিদ‘আত আখ্যা দেয়ার অধিকার
কোথায় পেলেন? সাড়ে তেরশ বছর পর যে মত
ও পথ আপনারা আবিস্কার করেছেন
সেগুলোকে প্রচার করছেন হাদীস বলে। আর এই
সূত্রে নিজেরা বনে গেলেন আহলে হাদীস।
এ কি হাদীসে রাসূলের সাথে প্রকাশ্য
বেয়াদবী নয় কি? যদি একে হাদীস অস্বীকার
না বলা হয় তাহলে হাদীস অস্বীকার
করতে কী করতে হয় আমাদের একটু বলেদিবেন
কি?
লামাযহাবীদের হাদীস অনুসরণের প্রকৃত রুপ
গাইরে মুকাল্লিদগণের হাদীসের অনুসরণ শুধু
তাদের দাবী পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। এর প্রকৃত বিবরণ
তাদের আলিমদের লেখনী থেকেই স্পষ্ট
হয়ে উঠে। এ সম্পর্কে তথাকথিত
আহলে হাদীসদের বড় আলেম নবাব সিদ্দিক
হাসান খানের বক্তব্য লক্ষ্য করুনঃ
“এই যামানায় এক সুখ্যাতিকামী ফিরকার জন্ম
হয়েছে, যারা শত অযোগ্যতা ও ত্রুটি-
বিচ্যতি সত্তেও নিজেদের কোরআন
হাদীসের আলেম ও তার উপর
আমলকারী হিসাবে দাবী করে, অথচ দ্বীনের
প্রকৃত বিজ্ঞ আলেমদের সাথে তাদের কোন
তুলনা নেই। কারণ তারা হাদীস
শাস্ত্রে পান্ডিত্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয়
সকল জ্ঞান থেকেই অজ্ঞ। তাই তাদের
দেখা যায় যে, তারা শুধু হাদীসের শব্দ বর্ণনার
মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে। হাদীসের অর্থ-
ব্যাখ্যা ও তৎ সংশ্লিষ্ট আহকামের
দিকে ভ্রুক্ষেপই করে না। তাদের ধারণা যে,
শুধু শব্দ বর্ণনা করাই যথেষ্ট। অথচ এ ধারণা সম্পুর্ন
বাস্তবতা পরিপন্থি। খোদার কসম এ খুবই আশ্চর্য
বিষয় যে, তারা নিজেদের পরিপুর্ণ মুসলমান
দাবী করে আর তারা ব্যতীত সকল
মুসলমানকে মুশরিক ও বেদ‘আতী সাব্যস্ত করে।
অথচ নিজেরাই দীনের ব্যাপারে চরম
গোড়াপন্থী ও হটকারী। (আল হিত্তা যিকরিস
সিহা সিত্তা ১৫৪ পৃষ্ঠা)
পাঠক বন্ধুগন! নবাব সাহেবের
যুগে লামাযহাবীর অবস্থা যদি এই হয়,
তাহলে বর্তমান যুগের লামাযহাবীদের
অবস্থা কি হতে পারে অনুমান করুন।
মাযহাবের পরিচয়
সকল মুসলমান একথা বিশ্বাস করে যে, দীনের
একমাত্র দাওয়াত ও আহবান হল শুধু আল্লাহর
আনুগত্য করা। এমনকি রাসূল সা. এর অনুসরণএই জন্যই
ফরয যে তিনি তার সকল কাজ-কর্মের
মাধ্যমে আল্লাহর প্রতিটি হুকুমের বাস্তবায়ন
করে দেখিয়েছেন। তাই হালাল, হারাম,
যায়েয, নাযায়েয,শরীয়তের সকল আহকামের
ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তার রাসূলের অনুসরণ
করতে হবে। আর কেউ যদি অন্য কোন সওাকে এ
পর্যায়ের অনুসরণ যোগ্য মনে করে,
তাহলে সে অবশ্যই ইসলামের
গন্ডি থেকে বেরিয়ে যাবে। কোরআন ও
সুন্নার অনুসরণের ক্ষেত্রে এ একটি ব্যাপার খুবই
স্পষ্ট যে, কোরআন সুন্নাহের কিছু আহকাম এমন
আছে যা সাধারণ শিক্ষিত ব্যক্তিও
বুঝে নিতে পারে। এর মধ্যে কোন
অস্পষ্টতা বা বৈপরিত্য পরিলক্ষিত হয় না।
এবং এর অর্থ বুঝে নিতে কোন ধরণের
ব্যাক্ষা বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু এরই
বিপরীতে কোরআন হাদীসের বহু আহকাম এমন
আছে যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে অন্য একটি আয়াত
বা হাদীসের বিপরীত মনে হয়। এ ক্ষেত্রে এর
সঠিক সমাধানে পৌঁছা দুস্কর হয়ে উঠে। এ
সমস্যার সমাধান দিতে পারবেন যারা একই
সাথে কোরআন, হাদীস, ইজমা,কিয়াস
তথা উলুমে শরীতের উপর পারদর্শী যা কোরআন
হাদীস থেকে মাসআলা বের করার জন্য
অত্যাবশ্যক। এসব গুণের অধিকারী ছিলেন
আইম্মায়ে মুজতাহিদীন।
যে কথাটি এখানে বিবেচনা করার পয়োজন
তা হলো, বর্তমান অধঃপতিত এ যুগে সত্যিকার
অর্থে উক্ত গুণাবলীর অধিকারী পাওয়া সম্ভব
নয়। কিন্তু এর বিপরিতে আইম্মায়ে মুজতাহিদীন
এক্ষেত্রে পূর্ণ যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন।
তাই আয়াত ও হাদীস থেকে মাসআলা বের
করা তাদের জন্য সহজ ছিল। উপরন্ত মেধা, স্বরণ
শক্তি ও আমানত দারীতায় তারা ছিলেন অনন্য।
তাই পরবর্তী উম্মত সকল যুগে নিজেদের
মেধা ও জ্ঞানের উপর ভরাস
না করে,পূর্ববর্তী ইমামদের থেকে যে কোন
একজনকে মুকতাদা তথা পথ পদর্শক হিসাবে গ্রহণ
করেছেন। যে ইমামগণ আহকামে শরইয়্যার
প্রতিটি সুক্ষ থেকে সুক্ষ বিষয়ের উপর
গবেষনা করে কোরআন হাদীস, ইজমা ও
কিয়াসে শরয়ীর আলোকে তার হুকুম
বাতলে দিয়ে গেছেন। আইম্মায়ে কেরামের
রেখে যাওয়া কোরআন হাদীসের সে বাস্তব
রুপ রেখাকেই পরিভাষায় (ফিকহী) মাযহাব
বলা হয়।
আহলে হাদীসের কর্মপন্থা
লামাযহাবীদের কিতাবাদী অধ্যায়ন
করলে তাদের কর্মপদ্ধতি অনেকাংশে এমনই
পাওয়া যায় যে, তারা মাযহাব পন্থীদের মতই
কোন স্পষ্ট সহীহ হাদীসের উপর তাদের
ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দেয় না।
তবে একটি ক্ষেত্রে তাদের পার্থক্য
দেখা যায় তাহল যে, সকল ক্ষেত্রে কোরআন
হাদীসে কোন স্পষ্ট হুকুম বিধিত
হয়নি সে ক্ষেত্রে মাযহাব পন্থীগণ
উসূলে শরয়ীর
আলোকে আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের সিদ্ধান্ত
গ্রহণ করেন। আর তারা প্রত্যেকে আপন আপন
বুঝের উপর আমল
করে অথবা নিজে না পারলে তাদের
কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়।
অনুরুপভাবে কোনটি হাদীস, কোনটি হাদীস নয়,
এবং হাদীসের ক্ষেত্র নির্ণয়ের
ক্ষেত্রে মাযহাব পন্থীগণ নবী যুগের
নিকটবর্তি ইমামগণের ফায়সালা ও সিদ্ধান্তকেই
চুড়ান্ত মনে করেন। পক্ষান্তরে এই দলটি এসব
ব্যাপারে পরবর্তী কোন আলেমের সিদ্ধান্ত
মেনে নেয়। ( যেমন হাফেজ
ইবনে তাইমিয়া মৃত৭২৮হিঃ হাফেজ
শাওকানী মৃত ১২৫০হিঃ, আল্লামা নাসিরুদ্দীন
আলবানী মৃত ঃ১৪২১হিঃ)এর উপর
ভিত্তি করে কোন হাদীসকে সহিহ বা যয়ীফ
বলে থাকে ।
তাদের স্ববিরুধী এই আচরণ থেকে স্বভাবতই
প্রশ্ন জাগে যে, তারা কোন বিশেষত্বের
কারণে নিজেদেরকে তাইমি,
নাসেরী নামের পরিবর্তে আহলে হাদীস নাম
করন করলেন। আর কোন ত্রুটির কারনে বিশ্বের
সকল মুসলমানদেরকে হাদীস
বিদ্বেষী মনে করলেন।
হাদীসে নববীকে সকল মুসলমান
যেভাবে মানে তারাও সেভাবেই মানলেন,
আর যে সমস্ত ক্ষেত্রে হাদীস
পাওয়া যায়নি সে সকল ক্ষেত্রে যেমন সকল
মুসলমান বিশেষজ্ঞ ইমামদের শরণাপন্ন হন ঠিক
তারাও কোন আলেমের শরণাপন্ন হয়। একই
ধারাবাহিকতায় মাযহাব পন্থীদের হানাফী,
শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী ইত্যাদি হওয়ার
অপরাধে তাদের ভাষায় মুশরিক হয়ে গেলেন
কিন্তু তারাও এরুপ ক্ষেত্রে তাদের আলেমদের
সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আহলে হাদীস
হয়ে গেলেন ? এ দ্বারা কি এ কথাই প্রমাণিত হয়
না যে, তারা নিজস্ব চিন্তাধারার আলেমদের
কথাকে হাদীস সাব্যস্ত করে নিয়েছে।
আহলে হাদীসের উদ্দেশ্য সুন্নাত জিন্দা নয়
ইখতিলাফ ও মতভেদ সৃষ্টি করা
তাদের দৃষ্টিতে সুন্নাতের খেলাফ
করা জায়েজ এবং সুন্নত ছাড়লে কোন গুনাহ
হবেনা। এর প্রমাণ স্বরুপ মৌলভী ছানাউল্লাহ
আমরতাসরীর বর্ণনা উল্লেখ করা যায়।
তিনি বলেন, সুন্নতকে মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য
নির্ধারণ করা হয়েছে, তাই সুন্নত
ছাড়লে মর্যাদা হ্রাস পায়। কিন্তু এ
কারণে আখেরাতে আল্লাহ পাকড়াও করবেন
না, ইনশাআল্লাহ।
নবাব সিদ্দীক হাসান খান লিখেন, নামাযের
মধ্যে সুন্নত হল ফাতেহা ও আমীনের পর
সুরা এবং অন্যান্য সুরা কোরআনের তারতীব
অনুসারে পড়া। যদি এই তারতীবের ব্যতিক্রম
পড়া হয় তাহলে নামায জায়েয হবে এবং মাকরুহ
হবে না। (নাযালাল
আবরার-৮৩পৃষ্ঠা,:ইযহারুততাহসীন পৃ:৪৭)
ইামাম ব্যতীত অন্যান্য সুন্নতের ব্যাপারেও
তাদের অনীহার চিত্র এরকমই পরিলক্ষিত হয়।
উপরোক্ত উদ্ধৃতির দ্বারা প্রমাণ হয় যে,
লামাযহাবীগণ সর্বসম্মত
সুন্নাতে মুয়াক্কাদা পালনকে অপ্রয়োজনীয়
মনে করে এবং এই সুন্নত ছেড়ে দেয়াকে গুণাহ
মনে করে না। বরং সুন্নত বহির্ভূত
আমলকে নির্দিধায় সহীহ বলে দেয়, কিন্তু
রফয়ে ইয়াদাইন, আমীন জোরে পড়া ও অন্যান্য
মাসআলা যেগুলো মুস্তাহাব হওয়ার
ব্যাপারে উম্মতের মাঝে ইখতিলাফ
আছে সেগুলো গুরুত্বের সাথে পালন করে যে,
এ ছাড়া কারো নামায সহীহ হবে না এবং কেউ
মুহাম্মদী হতে পারবে না। এ
আলোচনা দ্বারা স্পষ্ট প্রতিয়মান হয় যে,
আহলে হাদীসের উদ্দেশ্য সুন্নতের বাস্তবায়ন
নয়, বরং তাদের লক্ষ্য একটাই যে, সঠিক সমাধান
ব্যতীত বিরোধপূর্ণ মাসায়িলের প্রচার
করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা এবং আহলুস
সুন্নাহ ওয়াল জামাতের নীতির
প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা।
শেষ কথা
প্রবন্ধটির মূল উদ্দেশ্য ছিল সংক্ষিপ্ত
কলেবরে প্রকৃত আহলে হাদীস ও বর্তমান
যুগে নামধারী আহলে হাদীসের
মাঝে ঐতিহ্যগত পার্থক্য
তুলে ধরা এবং গাইরে মুকাল্লিদদের দীনের
নামে ইসলামী উম্মাহর মাঝে বিভেদ সৃষ্টি কুট-
কৌশলের মুখোশ উম্মোচন করা।
আশা করি সংক্ষিপ্ত পরিসরে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল
জামাতের মৌলিক আক্বিদাগুলো পাঠকের
সামনে সুস্পষ্ট
হয়ে গেছে এবং গাইরে মুকাল্লিদদের
বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা ও আহলে হকের
সাথে তাদের মতবিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো প্রকাশ
পেয়েছে। সাথে সাথে অকাট্য দলিল প্রমাণ
উপাস্থাপনের মাধ্যমে তাদের জবাব
দেয়া হয়েছে।
তাক্বলীদে-শাখ্ছী বা ব্যক্তি বিশেষের
অনুকরণ
‘তাক্বলীদে-শাখ্ছী’ বা ব্যক্তি-বিশেষের
অনুসরণ বলতে বুঝানো হয়-“কোন বিশেষ
মুজতাহিদ (মুজতাহিদ
বলাহয়.যিনি গবেষণা করে কোরআন-সুন্নাহ্
থেকে মাসায়িল আকারে ইসলামী আইন বের
করেন) এর সাথে সম্পর্ক যুক্ত মাযহাবের চুড়ান্ত
পর্যায়ের আইনসমূহের উপর দলীল-প্রমাণ তালাশ
করা ব্যতীত আমল করে যাওয়া। চাই উক্ত
কিধানাবলী সরাসরি মাযহাব প্রতিষ্ঠাতার
গবেষণালব্ধ হোক বা তাঁর রচিত মূলনীতির
আলোকে তাঁর শিষ্যরা গবেষণা করে বের করুক।
কিন্তু ওই মাযহাবেরই হওয়া চাই। আর
‘তাক্বলীদে-গাইরে-শাখ্ছী’
বলতে বুঝানো হয়, “দলীল-প্রমাণ তালাশ ব্যতীত
একাধিক মুজতাহিদের চুড়ান্ত পর্যায়ের বিধি-
বিধান অনুযায়ী আমল করতে থাকা। যেমন, এক
মাসআলা এই মাযহাবের, অন্য মাসআলা অন্য
মাযহাবের। মোট কথা, শুধু বিশেষ কোন এক
মাযহাব অনুসরণ না করা।”
প্রিয় নবী সা. এর যুগ থেকে শুরু করে দ্বিতীয়
শতাব্দীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত কোন নির্র্দিষ্ট
ব্যক্তি বিশেষের অনুসরণের প্রচলন ছিল না।
কারণ, তখন পর্যন্ত মুজতাহিদগণের গবেষণালব্ধ
ধর্মীয় বিধি-বিধানের মূলনীতিসমূহ সুশৃংখল ও
সুনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিসমাপ্তিতে পৌঁছেনি।
সুতরাং কোন বিশেষ মুজতাহিদের বের
করা বিধি-বিধানে আমল করা কঠিন ছিল।
তা ছাড়া উক্ত সময়ে মুজতাহিদগণের মধ্যেও
পরিপূর্ণ ‘তাক্বওয়া’ এবং নিষ্ঠার পরাকাষ্ঠা মজুদ
ছিল। তাই একাধিক মুজতাহিদের অনুসরণে কোন
রুপ কু-প্রবৃত্তির তাড়নার সম্ভবনাও ছিল না।
হযরত শাহ্ ওলীউল্লাহ (রহ) বলে,
“কেননা লোকজন সাহাবাদের যুগ থেকে শুরু
করে, মাযহাব চতুষ্টয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত
‘আলিম-সাহাবাদের অনুসরণ করে আসছিল, নিজ
নিজ সুবিধা অনুযায়ী অর্থাৎ
তারা আশে পাশে যেখানে যাকে পেয়েছেন
সেই ‘আলিম-সাহাবীর’ কথা অনুযায়ী আমল
করেছেন। এতে দ্বিমত করার মত
কাউকে পাওয়া যায়নি; বা উক্ত
তাক্বলীদকে কেউ মন্দও
ভাবেনি অথবা সমালোচনাও করেনি। যদি উক্ত
‘তাক্বলীদ’ মন্দ হত. তবে অবশ্যই অন্যান্য
সাহাবীগণ তা প্রতিহত-প্রতিরোধ করতেন।
অতঃপর হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষের
দিকে তৎকালীন ওলামায়ে রাব্বানীগণ
শরীয়তের বিধানাবলীকে মূলনীতি আকারে ও
শাখা-প্রশাখা আকারে রুপান্তরিত করতে শুরু
করলেন এবং তাঁদের যোগ্যতম শিষ্যগণ
তা সুশৃংখলিত এবং সুনিয়ন্ত্রিত করলেন। অতঃপর
তৃতীয় শতাব্দীর অগনীত মুসলমান
তা তাক্বলীদে শাখ্ছী আকারে পালন
করতে থাকে বা গ্রহণ করে নেয়।
উক্ত মূলনীতিরুপ বিধানাবলী এবং শাখা-
প্রশখামূলক বিধানাবলী, মস্পূর্ণ কোরআন-সুন্নাহ
অনুযায়ী প্রনয়ন করা হয়েছে।
তা ছাড়া এগুলোকে পুংখানু-
পুংখানরুপে যাচাই-বাছাই কারীগণও এমন ধরনের
ওলামায়ে রাব্বানী এবং মুজতাহিদ ছিলেন;
যাদের দ্বীনী ইলম,প্রজ্ঞা ও
নির্ভরযোগ্যতা সর্বজন গ্রাহ্য ছিল। উক্ত
মুজতাহিদের গবেষণালব্ধ বিধি-বিধান যেহেতু
অত্যন্ত সুন্দর ও সহজলভ্য ছিল, তাই তা দ্রুত
পরস্পরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। শাহ্ সাহেব
(রহঃ) বলেন, “তদানীন্তন সময়ে বর্তমানকার এই
তাক্বলীদই ওয়াজিব ছিল। দ্বিতীয় শতাব্দীর
পরে মুসলমানদের মধ্যে নির্দিষ্ট মুজতাহিদগণের
মাযহাব অনুযায়ী, তাক্বলীদের প্রচলন শুরু হয়। খুব
নগণ্য সংখ্যক লোকই এমন পাওয়া যেত যে,
তারা নির্দিষ্ট কোন গবেষকের
প্রতি আস্থাবান ছিলেন না। আর বর্তমানকার
তাক্বলীদও ঐ সেই যুগের ওয়াজিব তাক্বলেিদর
অন্তর্ভুক্ত। (আল্ ইন্সাফ ঃ৫৯পৃঃ)
চতুর্থ হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত মাযহাব-চতুষ্ঠয়
ব্যতীত অপরাপর মুজতাহিদেরও তাক্বলীদ
করা হত। কিন্তু উক্ত চার-মাযহাব ছাড়া অন্যান্য
মুজতাহিদদের মাযহাব তেমন সংরক্ষিত হয়নি;
যাতে করে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে।
যদ্দরুন চতুর্থ -শতাব্দী পরে আর কোন মাযহাব
অবশিষ্ট থাকেনি। আল্লাহ পাকের
মেহেরবানীতে উক্ত চার মাযহাবই ‘তাক্বলীদ’
সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। হযরত শাহ্ সাহেব(রহ)
বলেন, “আর যখন সব-মাযহাব নিঃশেস হয়ে শুধু
চার মাযহাবই অবশিষ্ট থাকলো তখন এ চার
মাযহাবের ( কোনএকটির) অনুসরণ বিমুখ
হওয়া মানে বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহ থেকে বের
হয়ে যাওয়া। (ইকদুল জীদ ঃ৩৮পৃঃ)
আল্লামা ইবনে খালদুন (রহঃ) তাঁর মুকাদ্দামায়
বলেন, “উক্ত চার ইমামের তাক্বলীদ
গোটা বিশ্বে চালু হয়ে গেছে। অনুসরণীয়
ব্যক্তিত্বগণ (আলিমগণ) অন্যান্যদের
শিক্ষা দিতে শুরু করলেন এবং সর্বসাধারণের
মধ্যে মতবিরোধ ও মতানৈক্যের ধারা বন্ধ
করে দিলেন। কারণ দ্বীনী ইল্মের
পরিভাষাসমূহ অনেক শাখা-প্রশাখায় ব্যাপক রুপ
ধারন করেছে। আর ইজতিহাদের স্তরে পৌঁছার
মত প্রতিভার অনেক বিরল হয়ে যাচ্ছিল।
তা ছাড়া অনুপযুক্ত-অযোগ্য লোক, যাদের মতামত
বা ধর্মের ব্যাপারে, আস্থা রাখা যায়না। এমন
ধরনের মুজতাহিদ নামধারীদের প্রাদুর্ভাবের
আশংকায়, উক্ত বিদ্যান-অনুসারীরা, নিজেদের
বেলায় অপারগতার (নতুন মতামত প্রতিষ্ঠার),
অন্যদের নিরুৎসাহিত করনের এবং মুসলমানদের
উক্ত চার ইমামের তাক্বলীদের দিকে ধাবিত
করতে লাগলেন, নিজ নিজ অনুসরণীয়
ব্যক্তিত্বের প্রতি। আর সতর্ক করতে থাকলেন
যাতে কেউ কখনও একজনের আবার কখনও
অন্যজনের তাক্বলীদ না করে।
কেননা এটা একটা তামাশার বস্তুতে পর্যবসিত
হয়ে যাবে। অতঃপর তাদের মাযহাব ব্যতীত অন্য
কোন মাযহাবের ধারাবাহিকতা অবশিষ্ট রইল
না। প্রত্যেক মুকাল্লিদ ব্যক্তি নিজ নিজ মাযহাব
সঠিক সূত্র-পরম্পরা ও পরিশুদ্ধি বজায় রেখে আমল
করে আসছেন। যা কিনা বর্তমানে আমাদের
সামনে‘ফিকাহ্’ নামে বিদ্যমান। তা ছাড়া এ
যুগে যারা মুজতাহিদ হওযার দাবী করবে,
তারা প্রত্যাখ্যাত। তাদের ‘তাক্বলীদ’
বা অনুসরণ নিষিদ্ধ। কেননা, তর্বমানে মুসলিম
বিশ্ব উক্ত চার ইমামের তাক্বলীদেই সীমিত
হয়ে গেছে।” (মুক্বাদ্দামা-ই-
ইবনে খালদুন ঃ ১০১৭পৃঃ)
বিখ্যাত উসূলবিদ ও গ্রন্থকার
আল্লামা মোল্লা জীউন (রহঃ)এ
প্রসঙ্গে অত্যন্ত সুন্দর উক্তি করেছেনঃ “প্রকৃত
নিরপেক্ষ কথা হল, (উক্ত ‘বিশেষ কোন
মাযহাব’মেনে নেওয়া প্রসঙ্গে) এই যে,
মাযহাবগুলো চারের মধ্যে সীমিত
হয়ে যাওয়া এবং মুসলমানদের অনুসরণ
করে যাওয়া, আল্লাহ্ তা’য়ালার বিশেষ
করুণা এবং অনুমোদন। এতে দলীল-প্রমাণ তালাশ
করে বা বেশী মাথা ঘামায়ে কোন
ফায়দা নেই। (তাফ্সীরাতে আহমদী ঃ২৯৭পৃষ্ঠা)
ব্যক্তি বিশেষের বা নির্দিষ্ট কোন
ব্যক্তিকে অনুসরণ করাও ওয়াজিব
ওয়াজিব বা জরুরীকর্ম দু ,প্রকার। যথা ঃ(১)
প্রত্যক্ষ ওয়াজিব (২) পরোক্ষ ওয়াজিব। প্রত্যক্ষ
ওয়াজিবের বেলায় তো কেউর কোন দ্বিমত
নেই। পরোক্ষ ওয়াজিব বলতে বুঝানো হয়,
যে কার্য সম্পাদন করতে সরাসরি ‘শরীয়ত’ কিছু
বলেনি বটে। তবে, যে সব
কর্মকে জরুরী করে দিয়েছে; সেগুলো সম্পাদন
উক্ত পরোক্ষ ওয়াজিব ব্যতীত বাস্তবেও সম্ভব।
তাই করনীয় বিষয়গুলোর খাতিরে উক্ত পরোক্ষ-
ওয়াজিব পালন করা জরুরী।
কেননা,“যে জরুরীকর্ম-সম্পাদন
করতে গিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে অন্য কোন
জরুরী কর্মের আশ্রয় নিতে হয়। সেই প্রাথমিক
পর্যায়ের কর্মটিও ওয়াজিব রুপে সাব্যস্ত থাকে।
” যেমন কোরআন ও হাদীস সংরক্ষণের
নিমিত্তে (৩০) ত্রিশ পারা একত্রিত করনের
ব্যাপার ও লিখনের ব্যাপার।
অনুরুপভাবে হাদীসসমূহ একত্রিত করন
বা লিখিতাকারে রুপদানের কথা, শরীয়তের
কোথাও ওয়াজিব বলা হয়নি। কিন্তু হিফাযত
বা সংরক্ষণ জরুরী করে দেয়া হয়েছে। অতঃপর
বাস্তবতার নিরিখে যখন দেখা গেল যে,
একত্রিত করণ বা লিখিতাকারে গ্রথিত করন
ছাড়া সংরক্ষণ সম্ভব নয়। তাই সর্ব
সম্মতিক্রমে একত্রিত করন ও লিপিবদ্ধ করাটাও
ওয়াজিব সাব্যস্ত হয়। সুতরাং এখানে “একত্রিত
করণ” ও “লিখন” শরীয়ত সমর্থিত পরোক্ষ ওয়াজিব।
যার কোন বিকল্প নেই। ঠিকতদ্রুপ ‘তাক্বলীদ’
বা ব্যক্তিবিশেষের অনুসরণও
জরুরী তথা ওয়াজিব। কেননা সুনির্দিষ্ট ইমামের
অনুসরণ পরিহার করলে এমন সব বিশৃংখলার উদ্ভব
ঘটে যেগুলো থেকে বাঁচা ওয়াজিব।
সুতরাং নির্দিষ্ট কোন ইমামের অনুসরণ
বা ‘তাক্বলীদ’ও ওয়াজিব।
এ ব্যাপারে কোন মুসলমানেরই দ্বিমত নেই, মানব
জাতির জন্য একমাত্র আল্লাহর হুকুম (বিধান/
দায়িত্ব) মেনে চলাই অব্যশ্যই কর্তব্য। অন্য
কারো নয়। কেননা, অন্য সবই তো মাখলুক
বা সৃষ্টি যার কারণে বিধান চলবে একমাত্র
তাঁরই। আর ¯্রষ্টাতো একমাত্র তিনিই। তবে হাঁ,
নবী-রাসূলগণের (অথবা তাঁদের
অবর্তমানে নায়েবে নবী বা খাটি আলেমদের)
আদেশ-নিষেধ কেন মানবো? নবী-রাসূলগণের
আদেশ-নিষেধ মান্য করা ওয়াজিব এই জন্য যে,
তাঁরা মহানআল্লাহ রাব্বুল আ-লামীনের পক্ষ
থেকে নির্বাচিত ও নিযুক্ত। তাঁরই আদেশ-
নিষেধ পৌঁছেদিবার দায়িত্ব পালন করেন
মাত্র। তাঁরা যা করতে বলেন অথবা যত কিছু
ছাড়তে বলেন, তা সব আল্লাহ তায়া’লারই
নির্দেশে বলে থাকেন।
তাঁরা ¯্রষ্টা এবং সৃষ্টির মধ্যে মাধ্যম স্বরুপ
হয়ে থাকেন। এই জন্যই স্বয়ং আল্লাহ পাক
নবীদের আনুগত্য/অনুসরণ মানুষের উপর ওয়াজিব
বা জরুরী করে দিয়েছেন। পবিত্র কালামের
একাধিক আয়াতে আল্লাহর নির্দেশ পালনের
সঙ্গে সঙ্গে রাসূলের নির্দেশও পালনের
কথা বলা হয়েছে। আবার এ কথাও বলা হয়েছে,
যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য বা অনুসরণ প্রদর্শন
করল সে যেন সরাসরি আল্লাহরই আনুগত্য প্রদর্শন
করল। ঠিত তদ্রুপ নবী/রাসূলদের
অবর্তমানে ‘নায়েবেনবী’ তথা শরীত
বিশেষজ্ঞ উলামাদের আনুগত্যের কথাও পবিত্র
কোরআনেই আছে। যেমন “অতএব
জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর,
যদি তোমাদের জানা না থাকে।” অন্যত্র
আছে “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর নির্দেশ মান্য
কর, নির্দেশ মান্য কর রাসূলের এবং তোমাদের
মধ্যে যারা বিচারক তাদের। এ কথা সতঃসিদ্ধ
যে, মুসলমাদের বিচারক সেই ব্যক্তিই
হতে পারে;যাঁর কোরআন-সুন্নাহর পর্যাপ্ত জ্ঞান
আছে।যিনি ফতোওয়া/ফায়সালা দানে সক্ষম
অর্থাৎ আলেমগণ ও শরয়ী মুফতিগণ।
(সুরা নিসা,আয়াত-৫৯)
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে,
সাহাবাদের পরে তাবেয়ী বা তাবঈ-
তাবেয়েিদর মধ্যে, বিশেষ করে ইমাম
চতুষ্টয়ের চেয়ে বড় আলেম বা বড় জ্ঞানী আর
কেউই ছিলেন না। তা ছাড়া বাস্তবতার
নিরিক্ষে বা বিগত ১৪০০ বছরের তুলনামূলক
সমীক্ষার আলোকে পর্যালোচনা করলে,
ভবিষ্যতে আর তাঁদের মত সুযোগ্য শরীয়ত
বিশেষজ্ঞ পয়দা হওয়ার সম্ভবনাও নেই বললেই
চলে। সুতরাং কেউ উক্ত শরীয়ত বিশেষজ্ঞ
মুজতাহিদ ইমামদের অনুসরণ করল মানেই
নববী আনুগত্য করল।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে,
নবী-রাসূলগণের অনুসরণ বা আনুগত্যে,
যেমনিভাবে আল্লাহর আনুগত্য-অনুসরণের
সাথে শিরক(অংশীদারিত্ব) সাব্যস্ত হয় না। ঠিক
তদ্রুপ মুজতাহিদ ইমামগণের
বা নায়েবে নবীদের আনুগত্য, অনুসরণ
(বা তাক্বলীদ)ও শিরক হিসাবে সাব্যস্ত
হতে পারে না। উক্ত আনুগত্য বা অনুসরণকেই
ফিক্বহের ভাষায় ‘তাক্বলীদ’ বলা হয়ে থাকে।
{ সমাপ্ত }

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s