হাদীস অস্বিকার করার নতুন রূপ।

প্রিয় ভাইয়েরা! আল্লাহ তাআলা যেমন
কাফেরদের মুকাবিলায় আমাদের নাম মুসলিম
রেখেছেন, তেমনি আহলে হাদীসের
মুকাবিলায় আমাদের নাম রাসূল
সাঃ আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত রেখেছেন।
আর এ জামাতকেই নাজাতপ্রাপ্ত জামাত
বলে ঘোষণা করেছেন।
আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ
পরিচয় হল, তারা মতভেদপূর্ণ হাদীসের
ক্ষেত্রে ঐ হাদীসের উপর আমল করে থাকে,
যা কুরআনে কারীম ও সুন্নতে রাসূল সাঃ এর
অনুগামী হয়। অর্থাৎ যে আমলটি নিরবচ্ছিন্ন সূত্র
পরম্পরায় জারি আছে তথা মুতাওয়াতির আমল।
সেই সাথে যা খুলাফায়ে রাশেদীন রাঃ,
এবং খায়রুল কুরুন তথা নবীজী সাঃ এর ঘোষিত
শ্রেষ্ঠতম যুগের আমলের অনুকুল হয়।
সেই হিসেবে যখন থেকে আমাদের
উপমহাদেশে ইসলাম এসেছে তখন থেকেই এ
পদ্ধতি জারি রয়েছে।
হ্যাঁ, ঐ সকল
ইজতিহাদী মাসআলা যা কিতাবুল্লাহ ও
সুন্নতে রাসূলের
মাঝে পরিস্কারভাবে উল্লেখিত নেই,
সেক্ষেত্রে এ উপমহাদেশে আমলের দিক
থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে শুধুমাত্র
হানাফী মাযহাবই জারি রয়েছে।
এ কারণে আমরা আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত
হওয়ার সাথে সাথে হানাফী। তথা আমাদের
হানাফীও বলা হয়ে থাকে।
আমাদের
নবীজী সাঃ যেমনিভাবে নাজাতপ্রাপ্ত
জামাতের পরিচয় যেমন পরিস্কার ভাষায়
বলেছেন, তেমনি পথভ্রষ্ট জামাতের কথাও
পরিস্কার ভাষায় উদ্ধৃত করেছেন।
আহলে কুরআন
আমাদের নবীজী সাঃ ইরশাদ করেছেন যে,
“আল্লাহ তাআলা আমাকে [কিতাবুল্লাহ] কুরআন
দিয়েছেন [যা উম্মতের মাঝে তিলাওয়াত
হিসেবে মুতাওয়াতির তথা নিরবচ্ছিন্ন সূত্র
পরম্পরায় জারি]। তেমনি সুন্নতও দিয়েছেন।
[যা উম্মতের মাঝে আমল
হিসেবে মুতাওয়াতির]।
তিনি আরো ইরশাদ করেনঃ শেষ জমানায় এমন
একদল আসবে, যারা বলবে যে, আমাদের জন্য
আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট। সুন্নতের কোন
প্রয়োজন নেই।”
এই দলটি রানী ভিক্টোরিয়ার আমলে এ
উপমহাদেশে জন্মলাভ করেছে। সাধারণ
মুসলমানদের ধোঁকা দেয়ার জন্য নিজেদের নাম
রেখেছে “আহলে কুরআন”।
আহলে কুরআন নিজেদের নাম
রেখে বলতে লাগল- “আহলে সুন্নতের
উলামাগণ মিথ্যা কথা বলছে যে, আহলে কুরআন
নাকি নতুন ফিরক্বা।
আসলে আহলে কুরআনতো সেই দিন থেকে শুরু
হয়েছে যেদিন থেকে হেরা গুহায় কুরআন
নাজিল শুরু হয়েছে। যেসব সাহাবাগণ কুরআনের
উপর ঈমান এনেছিল, তারা সবাই ছিলেন
আহলে কুরআন। যেহেতু কুরআন হক, আর সুনিশ্চিত
হক, সেখানে আহলে কুরআন হক হওয়ার
ব্যাপারে কি করে সন্দেহ থাকতে পারে?
যারা আহলে কুরআনকে ভ্রান্ত বলবে,
তারা নাউজুবিল্লাহ কুরআনকে ভ্রান্ত প্রমাণ
করুক। সকল তাবেয়ীগণ, তাবে তাবেয়ীগণ
আহলে কুরআন ছিলেন। মুহাম্মদ বিন কাসেম ও
আহলে কুরআন ছিলেন।
তিনি না বুখারী পড়েছেন, না মুসলিম,
না তিরমিজী, না নাসায়ী আবু দাউদ,
তিরমিজী পড়েছেন। না এসব কিতাবে তার
থেকে কোন হাদীস বর্ণিত আছে। যদি হাদীস
ও সুন্নত মানা ইসলামের অংশ
হতো তাহলে রাসূল সাঃ নিজের
নেগরানীতে কুরআনে কারীমের মত হাদীসও
সংকলিত করাতেন। আর সাহাবাগণ ও
তাবেয়ীগণ উক্ত সংকলণকে সংরক্ষিত
করে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছাতেন।
যেমনিভাবে কুরআনে কারীমকে তারা
আমাদের পর্যন্ত পৌঁছিয়েছেন।”
আহলে কুরআন নামধারীরা আরো বলে, “এসব
সিহাহ সিত্তার মাঝে একটি হাদীসের
কিতাবও খাইরুল কুরুনে বিদ্যমান ছিল না।”
অপরদিকে কথিত আহলে হাদীস নওয়াব সিদ্দিক
হাসান খান সাহেব সিহাহ সিত্তার সকল
সংকলককে অনারবী এবং পারস্যের বংশধর
বলে উল্লেখ করেছেন। {আউনুল বারী, ইতহাফুল
নুবালা}
এসব দেখে আহলে কুরআন
নামধারীরা আরো বেশি সুযোগ পেয়ে যায়।
বলতে থাকে, “কুরআন হল আরবী আর হাদীস হল
ইরানী”।
এ ভ্রান্ত ফিরক্বাটি কুরআনের ফযীলত
এবং কুরআন হিফজের ফযীলত সম্বলিত সকল
বর্ণনাকে নিজেদের উপর ফিট করে থাকে। আর
কুরআন মানার নামে হাদীসকে অস্বিকার
করে থাকে।
আহলে হাদীস
সুন্নত অস্বিকার করার যে পদ্ধতি আহলে কুরআন
নামধারীরা অবলম্বন করে তা ছিল সাধারণ
মুসলমানদের সমঝের বাহিরে। তারা এটিকে মন
থেকে গ্রহণ করতে পারেনি। শুধুমাত্র
ইংরেজী শিক্ষিত কিছু ব্যক্তি এ ধোঁকায়
বিভ্রান্ত হয়ে যায়। সাধারণ মুসলমানদের মন
থেকে সুন্নতের প্রতি মোহাব্বতের বিজ
উপড়ে ফেলতে নতুন কৌশলে নরম
পদ্ধতি অবলম্বন করা হল। আরেকটি নতুন দলের
সূচনা হল। নাম দেয়া হল আহলে হাদীস।
আহলে হাদীস নামধারীরাও আহলে কুরআন
নামধারীদের মত বলতে লাগল- “যেহেতু
হাদীস হক, তাই আহলে হাদীসও হক। যখন
থেকে হাদীস তখন থেকেই আহলে হাদীস
বিদ্যমান। আহলে হাদীসকে ভ্রান্ত প্রমাণ
করতে হলে হাদীসকে ভ্রান্ত প্রমাণ
করতে হবে।”
এ আহলে হাদীস ফিরক্বাটি সুন্নত,
হাফেজে হাদীস
এবং মুহাদ্দিসীনে কেরামের ফযীলত সম্বলিত
যত হাদীস বর্ণিত সবই নিজেদের উপর ফিট
করতে শুরু করে দিল।
এ দলটির সকল মেহনত ও আগ্রহ শুধু মতভেদপূর্ণ
হাদীসের দিকেই হয়ে থাকে। মতভেদপূর্ণ
হাদীসের মাঝেও ঐ হাদীসটি পছন্দ
করে থাকে, যা কুরআনে কারীমের বক্তব্যের
বিপরীত হয়ে থাকে। প্রতিটি ঐ হাদীসটি পছন্দ
করে থাকে, যা রাসূল সাঃ এর সুন্নত
এবং খুলাফায়ে রাশেদীন রাঃ ও খাইরুল
কুরুনের মুতাওয়াতির আমলের খেলাফ।
কুরআন ও সুন্নতের খেলাফ হাদীসের উপর আমল
করে নিজেদের হাদীসের উপর
আমলকারী দাবি করে থাকে। আর কুরআন ও
সুন্নতের মুয়াফিক হাদীসকে জঈফ এবং জাল-
বানোয়াট বলে কুরআন ও সুন্নতের উপর
আমলকারীদের রায়পূজারী বলে কটাক্ষ্য
করে থাকে। ইজতিহাদ ও কিয়াসকে ইবলিসের
কাজ, ইজতিহাদী মাসায়েলে মুজতাহিদের
তাকলীদকে শিরক, চার ইমামের খেলাফ দুই ফরজ
নামাযকে একত্রে পড়াকে জায়েজ,
খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত বিশ রাকাত
তারাবীহকে বিদআত এবং সুতার
পাতলা মোজার উপর মাসাহকে জায়েজ বলার
প্রবক্তা। সেই
সাথে ইজমা হওয়া মাসায়েলকেও অস্বিকার
করে থাকে।
একাধিক অনুলিপি
এখনতো তারা হাদীস অস্বিকার করার একটি নতুন
সূরত বের করে নিয়েছে। সেটি হল, যে হাদীস
তাদের মনের খেলাফ হবে সেটিকে তৎক্ষনাৎ
বলে দিবে-“ওমুক দেশে এই কিতাবের
যে হস্তলিপি রয়েছে তাতে এ হাদীস নেই।
তাই এ হাদীস বিলকুল মনগড়া।”
কখনো বলে-“এটি বিকৃত”।
এ ফিরক্বাটি “বিকৃত” শব্দটিকেই “বিকৃত”
করে ফেলছে। কোথাও যদি কম্পোজারের ভুল
হয়, তাহলে সেটিকে ‘বিকৃত’ বলে মন্তব্য
করে বসে। কোথাও যদি অনুলিপির ভিন্নতা হয়,
তাহলে সেটিকেও ‘বিকৃত’ বলে মন্তব্য
করে ফেলে।
মুয়াত্তা ইমাম মালিক রহঃ
মুয়াত্তা মালিক রহঃ এর প্রায়
১৬টি অনুলিপি আছে। হাফিজুল হাদীস
সালাহুদ্দীন আলায়ী রহঃ বলেন, “ইমাম মালিক
রহঃ থেকে বিভিন্ন জামাত মুয়াত্তার বর্ণনার
একত্রিত করেছেন। এসব অনুলিপিতে অগ্র-পশ্চাৎ
এবং কম-বেশির কারণে অনেক মতভেদ আছে।
মুয়াত্তা আবী মাসআবের মাঝে বাকি সকল
অনুলিপির তুলনায় একশত হাদীস অতিরিক্ত আছে।
কোন অনুলিপিতে কিছু হাদীস মওকুফ আছে।
আবার সেই হাদীসটিই আরেক
অনুলিপিতে মারফূ হিসেবে বিদ্যমান। কোন
কোন নুসখা তথা অনুলিপিতে কিছু হাদীস
মুরসাল হিসেবে বর্ণিত। আর সেই হাদীসটিই
আরেক অনুলিপিতে মুসনাদ তথা সনদসহ আছে।
কিছু অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে অগ্র-পশ্চাৎ
ইত্যাদি পার্থক্য বিরাজমান। {আতালীকুল
মামজাদ-১৯-২০}
এসব কম-বেশিকে সকল মুহাদ্দিসীনদের খেলাফ
গায়রে মুকাল্লিদরা তাহরীফ তথা বিকৃত
বলে নাম দিয়ে দিয়েছে।
সহীহ বুখারী
ইমাম বুখারী রহঃ ২৫৬ হিজরীতে “আলজামেউল
মুসনাদ আসসহীহ আলমুখতাসার মিন
উমূরী রাসূলিল্লাহি ওয়া সুনানিহী ওয়া
আইয়্যামিহী” নামে কিতাব সংকলন করেন।
এ কিতাবটি প্রায় ১৬ বছরে পূর্ণতা লাভ করে।
তারপরও এতে নজরে সানী ও সংযোজন-
বিয়োজন আমৃত্যু জারি ছিল। এ কারণেই ইমাম
বুখারী রহঃ এর সর্বশেষ ছাত্রদের একজন
ফারাবরী রহঃ এর সংকলিত অনুলিপিতে [প্রথম
দিককার ছাত্র] হাম্মাদ বিন শাকেরের
অনুলিপির থেকে ২০০ এবং ইবরাহীম বিন
মা’কাল এর অনুলিপির থেকে ৩০০ হাদীস
অতিরিক্ত বর্ণিত। {তাদরীবুর রাবী-৩০}
হাফেজ আবুল ওয়ালিদ [মৃত্যু-৪৭৪ হিজরী] বলেন,
“আমার কাছে আবূ যর হারয়ী বর্ণনা করেন যে,
তাকে আবূ ইসহাক মুস্তামলী বলেছেন,
আমি সহীহ বুখারীর আসল
অনুলিপি যা ফারাবরীর কাছে মওজুদ ছিল,
তা যখন অনুলিপি করলাম। তখন দেখলাম যে,
তাতে কিছু বিষয় আছে যা অপূর্ণাঙ্গ, আর কিছু
স্থান খালি। কিছু স্থানের শিরোনাম এমন ছিল,
যার পর কোন কিছুই লেখা ছিল না। আবার কিছু
হাদীস এমন ছিল যার উপরে কোন বাব
তথা পরিচ্ছেদের শিরোনাম ছিল না। তারপর
আমি এর একটিকে অন্যটির
সাথে মিলিয়ে দিলাম। {আততাদীল ওয়াত
তাখরীজ-১/৩১০}
ইমাম বুখারী রহঃ ছয় লক্ষ হাদীস থেকে এ
কিতাবটি সংকলিত করেছেন। সহীহ
বুখারী যদিও ইমাম
বুখারী রহঃ থেকে হাজারো মানুষ শুনেছে।
কিন্তু যেসব ছাত্রদের অনুলিপি দ্বারা সহীহ
বুখারীর
সিলসিলা জারি হয়েছে তারা ছিলেন চারজন।
যথা-
১- ইবরাহীম বিন মাকাল বিন হাজ্জাজ
আননাসাফী রহঃ [মৃত্যু-২৯৪ হিজরী]।
তিনি একাধারে মুহাদ্দিস এবং হানাফী ফক্বীহ
ছিলেন। হযরত হাফেজ আব্দুল কাদীর
কুরাইশী রহঃ তার সংকলিত “আলজাওয়াহিরুল
মাজিয়্যাহ ফী তারাজিমুল হানাফিয়্যাহ” নামক
গ্রন্থে ইবরাহীম নাসাফী রহঃ এর কথা উল্লেখ
করেছেন।
২- হাম্মাদ বিন শাকের
আননাসাফী আলহানাফী রহঃ [মৃত্যু-৩১১
হিজরী]। {তাজুল উরূস}
৩- মুহাম্মদ বিন ইউসুফ আলফিরাবরী রহঃ [মৃত্যু-৩২০]

৪- আবূ তালহা মানসূর বিন মুহাম্মদ
আলী আলবযদয়ী রহঃ [মৃত্যু-৩২৯ হিজরী]
এই চারজনের মাঝে একজনও গায়রে মুকাল্লিদ
ছিলেন না। কোন ঐতিহাসিকের ইতিহাস
গ্রন্থে একথা লিপিবদ্ধ নেই যে,
তারা না ইজতিহাদের যোগ্যতা রাখতেন,
না কারো মুকাল্লিদ ছিলেন।

Advertisements

One thought on “হাদীস অস্বিকার করার নতুন রূপ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s