যারা বলে মাজহাব মানি না শুধু কুরআন হাদীস মানি, তাদের জিহালতী খন্ডনে সামান্য আলোকপাত

ﺑﺴﻢ ﺍﷲ ﺍﻟﺮ ﺣﻤﻦ ﺍﻟﺮ ﺣﻴﻢ
মুসলমান মাত্রই আমরা বিশ্বাস করি “আল্লাহ
এবং রসুলের আনুগত্য/অনুসরন করতে হবে” ।
আল্লাহর অনুসরন বলতে বুঝায় তার আদেশ নিষেধ
মেনে চলা , যেগুলো কোরআন
শরীফে বলা আছে । আর রসুলের আনুগত্য/অনুসরন
বলতে বুঝায় তার আদেশ নিষেধ
মেনে চলা যেটা কোরআন এবং হাদিস
উভয়টিতে আছে ।
মুসলমান মাত্রই একথা একবাক্যে স্বীকার
করবে আল্লাহ এবং রসুলকে অনুসরন করতে হবে ।
কিন্তু কিভাবে ?
সেটাই আজকের আলোচনার বিষয় । অনেকের
মধ্যেই ধারনা আছে “কোরআন” এবং “হাদিস”
পড়ে নিজে নিজে যেটা বুঝলাম সেটাই
হচ্ছে সর্বোত্তম পন্হা । সহীহ হাদিস শরীফ
থেকে সরাসরি অনুসরন করতে গেলে কি সমস্যায়
আপনি পড়তে পারেন সেটা আমরা দেখিয়েছি ।
এবং কোরআন এর ক্ষেত্রেও এটা সত্য ।
সুতরাং সরাসরি “কোরআন” , “হাদিস” থেকে হুকুম
আহকাম বের করা যেকারো জন্য বিপদ
ডেকে আনতে পারে । আসুন এই বিষয়টি এখন
পর্যালোচনা করে দেখি ।
প্রথমে আমরা দেখব একজন “কোরআন” , “হাদিস”
থেকে সরাসরি অনুসরন করতে গেলে তার
কি কি জানতে হবে ? মনে করুন আপনি নামাজ
পড়ার নিয়ম কানুন জানতে চান ।
তাহলে যেটা করতে হবে সেটা হোলো :
১) প্রথমে আপনার “আরবী ভাষার”
ওপরে অসাধারন দক্ষতা অর্জন করতে হবে
২) সমগ্র কোরআন শরীফ তাহকীক করে বের
করতে হবে নামাজ বিষয়ে কত জায়গায় উল্লেখ
করা হয়েছে ।
৩) তারপর সমগ্র আয়াতের
মধ্যে থেকে জানতে হবে কোনটা নাসেখ ,
কোনটা মনসুখ ।
৪) নামাজ সংক্রান্ত প্রতিটি আয়াতের
শানে নজুল জানতে হবে ।
৫) নামাজ সংক্রান্ত পৃথিবীতে যত হাদিস শরীফ
আছে , সেগুলো আপনার প্রথমে এক জায়গায়
করতে হবে ।
৬) তারপর এই সংক্রান্ত সকল হাদিস
থেকে দেখতে হবে “কোনটি সহীহ,
কোনটি হাসান , কোনটি জঈফ, কোনটি জাল”
ইত্যাদি ।
৭) সাহাবীরা হাদিস বিষয়ে কি বলে গেছেন ,
নামাজ বিষয়ে ওনাদের আমল কি ছিল ,
তাবেয়ীন , তাবে-তাবেয়ীন সবার আমল
ইত্যাদি পর্যালোচনা করতে হবে ।
৮) পরস্পরবিরোধী হাদিস শরীফের
মধ্যে সামন্জস্য বিধান করতে হবে । অর্থ্যাৎ
দুটি সহীহ হাদিস
পরস্পরবিরোধি হলে কেনো একটিকে গ্রহন
করে আপনি অন্যটি বাদ দিয়েছেন সেটার সুস্পস্ট
ব্যাখ্যা দিতে হবে ।
৯) হাদিসের নাসেখ মানসুখ জানতে হবে ।
১০) সাহাবীরা , তাবেয়ীনগন ,
ছলফে সালেহীনগন কি পদ্ধতিতে মাসআলা বের
করেছেন সেটা জানতে হবে ।
১১ ) উসুলে কোরআন , উসুলে হাদিস ,
উসুলে ফিকাহতে অসাধারন
বুৎপত্তি থাকতে হবে ।
১২) কোরআন হাদিস উভয়ের ক্ষেত্রে “সাধারন”
এবং “বিশেষ” হুকুম এর মধ্যে পার্থক্য নির্নয় করার
দক্ষতা থাকতে হবে
১৩) নামাজে “ফরজ” , “ওয়াজিব” , “সুন্নত” “নফল”
“মোবাহ” ইত্যাদি কেনো হয় , সেগুলোর
মধ্যে পার্থক্য জানতে হবে ।
১৪) নামাজের ক্ষেত্রে রসুলের (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমল কি ছিল ,
সাহাবীদের আমল কি ছিল , দুটোর
মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল কিনা ?
থাকলে কেনো ? আমরা কোনটা অনুসরন করব?
ইত্যাদি ।
১৫) নামাজ সংক্রান্ত রসুলের (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোনো আমল
কি সে সময়ের জন্য প্রযোজ্য নাকি চিরন্তন
সেটার পার্থক্য বোঝার
মতো দক্ষতা থাকতে হবে
১৬) রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
যে আমল করেছেন সেটা কি শধুমাত্র ওনার জন্য
নির্দিষ্ট কিনা ? ( যেমন ঘুমালে ওনার অজু
ভাংতো না )
উপরে অনেকগুলো দক্ষতার মধ্যে মাত্র
কয়েকটি উল্লেখ করা হোলো , যেটা একজনের
“কোরআন” “হাদিস” থেকে শুধু নামাজের
মাসআলা বের করতে চাইলে অবশ্যই অবশ্যই
থাকতে হবে । সেটা কি আমাদের আছে ?
না নেই । তাহলে আমরা বুঝতে পারছি , আমাদের
যেহেতু এই দক্ষতা নেই, তাই যারা এই কাজে দক্ষ
তাদের অনুসরন করতে হবে । দলীল ? দেখুন :
ﻓَﺎﺳْﺄَﻟُﻮﺍْ ﺃَﻫْﻞَ ﺍﻟﺬِّﻛْﺮِ ﺇِﻥ ﻛُﻨﺘُﻢْ ﻻَ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮﻥَ
অতএব জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর,
যদি তোমাদের জানা না থাকে; (সুরাহ নাহল :
৪৩ )
আরো একটি আয়াত শরীফের মাধ্যমে ফকীহ ,
মুজতাহিদের অনুসরন করতে বলা হয়েছে :
আয়াতটি হচ্ছে সূরা নিসার ৫৯ নম্বর আয়াত:
ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺁَﻣَﻨُﻮﺍ ﺃَﻃِﻴﻌُﻮﺍ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻭَﺃَﻃِﻴﻌُﻮﺍ ﺍﻟﺮَّﺳُﻮﻝَ ﻭَﺃُﻭﻟِﻲ ﺍﻟْﺄَﻣْﺮِ ﻣِﻨْﻜُﻢْ
ﻓَﺈِﻥْ ﺗَﻨَﺎﺯَﻋْﺘُﻢْ ﻓِﻲ ﺷَﻲْﺀٍ ﻓَﺮُﺩُّﻭﻩُ ﺇِﻟَﻰ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻭَﺍﻟﺮَّﺳُﻮﻝِ ﺇِﻥْ ﻛُﻨْﺘُﻢْ ﺗُﺆْﻣِﻨُﻮﻥَ
ﺑِﺎﻟﻠَّﻪِ ﻭَﺍﻟْﻴَﻮْﻡِ ﺍﻟْﺂَﺧِﺮِ ﺫَﻟِﻚَ ﺧَﻴْﺮٌ ﻭَﺃَﺣْﺴَﻦُ ﺗَﺄْﻭِﻳﻠًﺎ
“হে মু’মিনগণ, যদি তোমরা আল্লাহ ও
আখিরাতে বিশ্বাস কর, তবে আল্লাহর আনুগত্য কর,
রাসূলের আনুগত্য কর এবং তাদের,
যারা তোমাদের মধ্যে উলিল আমর । কোন
বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে,
তা আল্লাহ ও রাসূলের কাছে উপস্থিত কর । এটাই
শ্রেয় এবং পরিণাম এটাই প্রকৃষ্টতর
।” (সূরা নিসা ৪:৫৯)
কোনো কোনো তফসীরকারক “উলিল আমর”
বলতে “শাসক বর্গকে” আবার কেউ কেউ
“মুজতাহিদ”দেরকে বুঝিয়েছেন । হযরত জাবির
ইবনে আব্দুল্লাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) ,
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু
তায়ালা আনহু) , হযরত মুজাহিদ
(রহমতুল্লাহি আলাইহি) , আতা বিন রবীহ
(রহমতুল্লাহি আলাইহি) , হাসান
বসরী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) প্রমুখ জগৎবিখ্যাত
তফসীরকারকগন উলিল আমর বলতে “ফকীহ
এবং মুজতাহিদগনকে” বুঝিয়েছেন । ইমাম আবু বকর
জাসসাস (রহমতুল্লাহি আলাইহি) এর
মতে “রাজনীতি ও প্রসাশনের”
ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ন
শাসককে এবং মাসআলা মাসায়েলের
ক্ষেত্রে “ফকীহ ও মুজতাহিদগনকে” অনুসরন করার
কথা বলা হয়েছে । এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে দুই
ব্যাখ্যার মধ্যে সামন্জস্য বিধান হয় ।
তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম , আমাদের
জানা না থাকলে , যারা জানে বা আলেম
তাদের জিজ্ঞেস করে জানতে হবে বা তাদের
অনুসরন করতে হবে । এটাই তকলীদ ।
সাহাবা এবং তকলীদ :
হযরত ইবনে আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)
বলেন “জাবিয়া নামক স্হানে হযরত ওমর
(রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)
খুৎবা দিতে গিয়ে বললেন লোক সকল ! কোরআন
(ইলমুল কিরাত) সম্পর্কে তোমাদের কোনো প্রশ্ন
থাকলে উবাই ইবনে কাব (রাদ্বিয়াল্লাহু
তায়ালা আনহু) কাছে এবং ফারায়েজ
সম্পর্কে কিছু জানার থাকলে যায়েদ
ইবনে সাবেত (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) এর
কাছে আর ফিকাহ সম্পর্কে কিছু জানার
থাকলে মুআজ ইবনে জাবাল (রাদ্বিয়াল্লাহু
তায়ালা আনহু) এর কাছে যাবে । তবে অর্থ সম্পদ
সংক্রান্ত কিছু জানার থাকলে আমার
কাছে আসবে । কেননা আল্লাহ আমাকে এর বন্টন
এবং তত্বাবধানের কাজে নিযুক্ত করেছেন ।
দেখুন ওমর (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) নির্দেশ
দিচ্ছেন সাহাবাদের অন্য সাহাবাদের তকলীদ
করার জন্য । কেননা যে সাহাবারা মুজতাহিদ
ছিলেন না তারাও মুজতাহিদ
সাহাবাগনকে অনুসরন বা তকলীদ করতেন ।
সুতরাং আমরা এই দলীলের
মাধ্যমে জানতে পারলাম “আল্লাহ এবং রসুলকে”
কেউ যদি অনুসরন করতে চায় , তবে “কোরআন”
“হাদিস” পড়ে নিজের
মনমতো বুঝলে বা ব্যাখ্যা দাড় করালে হবে না ।
এটা সুন্নত পদ্ধতি নয় । সুন্নত হোলো তাই
যেটা উপরে আলোচনা করা হোলো । ফকীহ
বা মুজতাহিদ আলেমেকে অনুসরন করতে হবে ।
এখন আমরা এ সংক্রান্ত কিছু অভিযোগ
নিয়ে আলোচনা করব :
১ম অভিযোগ খন্ডন: [ আলেমদের মধ্যে মতভেদ
হলে কোরআন হাদিস অনুসরন করাই ভালো ]
কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে,
তা আল্লাহ ও রাসূলের কাছে উপস্থিত কর । এটাই
শ্রেয় এবং পরিণাম এটাই প্রকৃষ্টতর
।” (সূরা নিসা ৪:৫৯)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় অনেকে বলেন , যেহেতু
মতভেদ হলে আল্লাহ এবং রসুলের
দিকে প্রত্যাবর্তন করতে বলা হয়েছে , তাই
মতভেদ দেখা দিলে কোনো আলেমের বক্তব্য
না মেনে সরাসরি “কোরআন” এবং “হাদিস”
থেকে আমরা যেটা বুঝি সেটাই অনুসরন করার
চেষ্টা করবো । আপনি যদি এভাবে চিন্তা করেন
তাহলে সম্পূর্ন ভুল করলেন ।
কেননা এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আবু বকর
জাসসাস তার বিখ্যাত তফসীর “আহকামুল
কোরআনে” বলেছেন “তোমরা কোন
বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়,
তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ
কর” এই আদেশ সাধারন মুসলমানদের দেয়া হয়নি, এই
আয়াত আদেশ করা হয়েছে “ফকীহ মুজতাহিদ”দের
। অর্থ্যাৎ কোন বিষয়ে মতবিরোধ
দেখা দিলে “ফকীহ মুজতাহিদ”দের দায়িত্ব
আল্লাহর কিতাব এবং রসুলের সুন্নাহর
মাধ্যমে ফয়সালা দেয়া । সাধারন মুসলমানের
দায়িত্ব নয় নিজ কাধে দায়িত্ব
নিয়ে যোগ্যতা না থাকা সত্বেও “কোরআন
হাদিসের” নিজস্ব ব্যাখ্যা দেয়া ।
অনেকে এই আয়াতের মাধ্যমে প্রমান করতে চায়
“৪ মাজহাবে” যেহেতু অনেক বিরোধ
দেখা যায় , তাই সেইক্ষেত্রে কোনোটি অনুসরন
না করে , “কোরআন” “হাদিস”
থেকে সরাসরি অনুসরন করাই ভালো হয় । তাদের
এই কথা যে সম্পূর্ন ভুল সেটা আমরা উপরের
আলোচনা দ্বারা বুঝলাম ।
এছাড়া এইসব ক্ষেত্রে সাহাবীরা কি করতেন
আসুন আমরা দেখি :
হাদিস শরীফ: সহীহ বুখারীসহ অন্যান্য
হাদিসগ্রন্হে হযরত হুযাইল ইবনে শুরাহবীল
( রহমতুল্লাহি আলাইহি) এর
সূত্রে একটি ঘটনা বর্নিত আছে ।
ঘটনাটি হোলো “একবার কিছু লোক হযরত আবু
মুসা আশআরী (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)
কে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করল ।
তিনি সংগে সংগেই তার মাসআলা বলে দেন ।
সাথে এও বলে দেন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ
(রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) জিজ্ঞেস
করে নিও । কথামতো তারা ইবনে মাসউদ
(রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) এর
দরবারে গেলো । মাসআলাটি তাকেও
জিজ্ঞেস করা হোলো । সেই সাথে আবু
মুসা আশআরী (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) এর
ফয়সালাও জানানো হোলো । তখন হযরত
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদ্বিয়াল্লাহু
তায়ালা আনহু) যে ফতোয়া দেন তা ছিল হযরত
আবু মুসা আশআরী (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)
এর ফতোয়া থেকে সম্পূর্ন ভিন্ন । তখন
তারা গিয়ে হযরত আবু
মুসা আশআরী (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)
কে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদ্বিয়াল্লাহু
তায়ালা আনহু) যে ফতোয়া দেন তা শোনান । এই
ফতোয়া শোনার পর হযরত আবু
মুসা আশআরী (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)
বলেন :
“যতদিন পর্যন্ত তোমাদের মাঝে এই বিজ্ঞ
আলেম বেচে থাকবে ততদিন পর্যন্ত
আমাকে কোনো মাসআলা জিজ্ঞেস করো না ”

উপরের ঘটনা দ্বারা আমরা জানতে পারলাম ,
মতভেদ হলেও হযরত আবু
মুসা আশআরী (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)
সাহাবীদের বলেননি “যেহেতু আমাদের
মধ্যে মতভেদ হয়েছে তাই তোমরা কোরআন
হাদিস থেকে যা বোঝো তাই অনুসরন কর ।
বরং উনি বলেছিলেন সবসময় তোমরা আবদুল্লাহ
ইবনে মাসউদ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)
কে জিজ্ঞেস কর । কেননা সেই ছিল অধিক
বিজ্ঞ এবং অনুসরন করার যোগ্য ।
এই ঘটনার দ্বারা আমরা বুঝতে পারলাম , মতভেদ
হলে নিজে নিজে কোরআন হাদিস
থেকে মাসআলা বের না করে ,
যে বেশী যোগ্য তার মাসআলা অনুসরন
করতে হবে । এটাই সাহাবীদের সুন্নত ।
২য় অভিযোগ খন্ডন : [ অনুসরন করতে হবে তাই
বলে অন্ধ অনুসরন নয় ]
অনেকে বলে থাকে অনুসরন করতে হবে তাই
বলে অন্ধ অনুসরন ? ইদানিং এই টার্মটা প্রচুর
শোনা যায় কিন্তু কেউ সাধারনত
ব্যাখ্যা করে না । এবার আমরা দেখব অন্ধ অনুকরন
কি ? অনেকে মনে করে দলীল
ছাড়া কারো কথা মেনে চলাই হোলো অন্ধ
অনুকরন । নীচের ঘটনা দ্বারা আমরা দেখব
কথাটা সম্পূর্ন ভুল :
হযরত সহল বিন মোআজ তার বাবার কাছ
থেকে রেওয়ায়েত করেছেন : জনৈক
মহিলা সাহাবী রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর খিদমতে হাজির
হয়ে বললেন “ইয়া রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার
স্বামী জিহাদে গিয়েছেন ।
তিনি থাকতে আমি তার সালাত ও অন্যান্য কাজ
অনুসরন করতাম । এখন তার ফিরে আসা পর্যন্ত এমন
কোনো আমল আমাকে বাতলে দিন যা তার
আমলের সমমর্যাদায় আমাকে পৌছিয়ে দিবে ।
(মুসনাদে আহমদ )
দেখুন মহিলা সাহাবী সালাতসহ অন্যান্য সমস্ত
আমলে তার স্বামীর তাকলীদ করতেন দলীল
খোজা ব্যতীত অথচ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিষেধ বা অসম্মতি প্রকাশ
করেননি । সুতরাং দলীল ছাড়াও অনসুরন করা যায়
কিন্তু শর্ত হোলো যাকে অনসুরন
করা হচ্ছে সে “মুজতাহিদ” বা যোগ্যতাসম্পন্ন
হতে হবে ।
সুতরাং আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে যথাসাধ্য
চেষ্টা করে ফকীহ মুজতাহিদ খুজে বের করা ,
এবং একবার খুজে বের করার পর সব কাজে দলীল
খোজার দরকার নেই । যেমন ধরুন আপনি জানেন
আপনার পিতা মাতা কে ? এখন
তারা কোনো আদেশ
দিলে আপনি যদি প্রতিবারই প্রমান করেতে চান
দলীল সহ আপনার পিতা মাতা আসলেই সঠিক
আপনার পিতা মাতা কিনা , তাহলে জীবন দুর্বিষহ
হয়ে উঠবে । এভাবে আপনি কোনো কাজেই
আগ্রহ পাবেন না , এবং ক্রমশ
সর্বক্ষেত্রে অগ্রগতীর
পরিবরর্তে আরো পিছিয়ে পড়বেন ।
সব মাসআলার ক্ষেত্রে দলীল বের
করতে চাইলে “মুজতাহিদ” আর তার মধ্যে পার্থক্য
থাকলো কোথায় ? এবং এ কাজ
করতে যেয়ে একজনের চাকরী , ব্যবসা সবকিছু
বন্ধ করে শুধু এই কাজই করতে হবে । যেটা মুলত
পৃথিবীকে অচল করে দেবার মতো অবস্হা ।
অনেকে হয়ত এই কথায় হতাশ হবেন কিন্তু একটু
বাস্তব পরিস্হিতি বিচার বিশ্লেষন
করলে আপনারা বুঝতে পারবেন আমরা কেউ
আমাদের প্রাত্যহিক সব আমলের দলীল জানি না ।
কিন্তু নিজের অজান্তে হোক বা অনিচ্ছায় হোক
এটা স্বীকার করি না ।
নিজেকে এই প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করুন তাহলেই
উত্তর পেয়ে যাবেন ।
আপনি মাজহাব অনুসরন করুন
বা আলবানী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) কে অনুসরন
করুন যেটাই হোক আপনি কি এই এই প্রশ্নগুলোর
দলীল ভিত্তিক সমাধান দিতে পারবেন ?
ক) জোহর নামাজে কয় রাকাত ? সুন্নত , ফরজ কয়
রাকাত ? কেউ যদি ভুলে জোহের ফরজ ৩
রাকাআত পড়ে সালাম
ফিরিয়ে ফেলে তাহলে বাকী নামাজ
কিভাবে আদায় করবে ?
খ) নামাজে রুকু না করে কেউ
যদি সরাসরি সেজদায় চলে যায় , তাহলে তার
ক্ষেত্রে হুকুম কি ?
গ) বিতের কখন পড়তে হয় ? বিতর পড়ার সম্পূর্ন নিয়ম
কি ?
ঘ) মুসাফির অবস্হায় কিভাবে নামাজ
পড়তে হবে ?
ঙ) সুরাহ ফাতিহা বাংলায় পড়লে হবে কিনা ?
উপরে আমি মাত্র ৫ টি প্রশ্ন করলাম , এগুলোর
কোরআন হাদিস ভিত্তিক দলীল কি আমাদের
কারো জানা আছে ? নেই । আর
মনে রাখতে হবে “দলীল জানা শর্ত নয় , শর্ত
হোলো ইসলামের সহীহ আহকাম, আকীদা জানা”
। এইজন্য কবরে আমাদের জিজ্ঞেস
করা হবে “তোমার রব কে ? ধর্ম কি ? রসুল কে ? ”
আমাদের কিন্তু জিজ্ঞেস করা হবে না “কোরআন
হাদিসের কোথায় কত নম্বর সুরায় আছে “রব কে” ?
“কোন হাদিসে আছে রসুল কে? ” বরং সঠিক
বিষয়টি জানলেই হোলো । বরং দলীল
খুজতে যেয়ে সে যদি সঠিক আমল
না করতে পারে তার জন্য তার
জবাবদিহি করতে হবে । তাই যেসব
সাহাবী মুজতাহিদ ছিলেন না তারাও দলীল
খুজতেন না , মাসআলা জানার জন্য মুজতাহিদ
সাহাবীদের কাছে যেতেন এবং জেনে আমল
করতেন ।
এই ব্যাখ্যায় কেউ যেন মনে না করে “দলীল
খোজা যাবে না” । দলীল অবশ্যই খোজা যাবে ,
তবে এটা শর্ত নয় । দলীল খোজার দায়িত্ব
মুজতাহিদের , আর সাধারনের দায়িত্ব
যোগ্যতাসম্পন্ন মুজতাহিদ খুজে বের করা ।
৩য় অভিযোগ খন্ডন : [ পূর্ব পূরুষদের অনুসরন করা ]
অনেকে তকলীদ করাকে নীচের আয়াতের
সাথে মিলিয়ে ফেলে :
ﻭَﺇِﺫَﺍ ﻗِﻴﻞَ ﻟَﻬُﻢُ ﺍﺗَّﺒِﻌُﻮﺍ ﻣَﺎ ﺃَﻧﺰَﻝَ ﺍﻟﻠّﻪُ ﻗَﺎﻟُﻮﺍْ ﺑَﻞْ ﻧَﺘَّﺒِﻊُ ﻣَﺎ ﺃَﻟْﻔَﻴْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﺁﺑَﺎﺀﻧَﺎ
ﺃَﻭَﻟَﻮْ ﻛَﺎﻥَ ﺁﺑَﺎﺅُﻫُﻢْ ﻻَ ﻳَﻌْﻘِﻠُﻮﻥَ ﺷَﻴْﺌﺎً ﻭَﻻَ ﻳَﻬْﺘَﺪُﻭﻥَ
আর যখন তাদেরকে কেউ বলে যে, সে হুকুমেরই
আনুগত্য কর যা আল্লাহ তা’আলা নাযিল করেছেন,
তখন তারা বলে কখনো না,
আমরা তো সে বিষয়েরই অনুসরণ করব।
যাতে আমরা আমাদের বাপ-
দাদাদেরকে দেখেছি। যদি ও তাদের বাপ
দাদারা কিছুই জানতো না, জানতো না সরল পথও।
( সুরাহ বাকারা : ১৭০ )
এই উদাহরন যারা দেয় তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য
এই হাদিস শরীফ :
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
বলেন “যে ব্যক্তি পবিত্র কোরানের
ব্যাপারে মনগড়া কিছু বলে সেটা ঠিক হলেও
সে ভুল করেছে” ।
মুশরিকরা যেটা করতো তাহোলো , তাদের পূর্ব
পুরুষ শরীয়তবিরোধী মূর্তপূজা করত আর
তারা সেটাই অনুসরন করত । শরীয়ত
বিরোধী কোনো কাজ যদি কেউ
করে তাহলে তাকে কস্মিনকালেও অনুসরন
করা যাবে না । হক তার সামনে উদ্ভাসিত হবার পর
না-হক অনুসরন করা জায়েজ নেই । কিন্তু
এখানে তা বলা হচ্ছে না ।
আয়াতে বলা হয়েছে তাদের বাপ দাদারা কিছু
জানত না । আর আমরা বলছি অবশ্যই যাকে অনুসরন
করবে সে ফকীহ মুজতাহিদ হতে হবে , শরীয়তের
উপর তার থাকতে হবে
দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হোলো “তওহীদ”
তথা আকীদা সংক্রান্ত বিষয়ে মক্কার
মুশরিকরা পূর্ব পুরুষদের অনুসরন করত । কিন্তু
কোনো মুসলমান “আল্লাহ এক, রসুলুল্লাহ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শেষ নবী ,
পরকাল , কবর , দোজখ ”
ইত্যাদি বুনিয়াদি আকীদাসমূহের জন্য
কারো তকলীদ করে না ।
এগুলোতে কারো অনুসরন করার প্রয়োজন নেই ।
মুজতাহিদ আলেমদের অনুসরন করতে হয় “ইসলামিক
জুরিসপ্রডেন্স” বা ফিকাহ সংক্রান্ত বিষয় ।
তদুপুরি ইসলামের হুকুম আহকাম প্রাকটিস করার
বিষয়ে ।
৪র্থ অভিযোগ খন্ডন : [ আলেমদের
না মুজতাহিদের অনুসরন করব ? ]
কোরআন হাদিস থেকে মাসআলা বের করবেন
“মুজতাহিদগন” আর এগুলো আমাদের
বুঝিয়ে দিবেন আলেম বা মুফতীগন । অর্থ্যাৎ
মুজতাহিদগন কিভাবে মাসআলা বের করেছেন
সেটা বোঝার যোগ্যতাও আমাদের নেই বললেই
চলবে । সেটাই বুঝাবেন ১০/২০/৩০ বছর
ধরে যারা প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামিক শিক্ষায়
শিক্ষিত আলেম/মুফতী/মাওলানা গন তারা ।
তকলীদ করেছেন এমন কিছু বিখ্যাত আলেমদের
উদাহরন
বিশ্ববিখ্যাত কয়েকজন আলেমের উদাহরন
দেয়া হোলো যারা অসামান্য পন্ডিত
হওয়া সত্বেও তকলীদ করতেন :
১। মোল্লা আলী কারী – > হানাফী
২। ইমাম তাহাবী -> হানাফী
৩। ইবনে কাসির -> আশ শাফেয়ী
৪। ইমাম যাহাবী -> আশ শাফেয়ী
৫। ইবনে হাজার আসকালানী -> আশ শাফেয়ী
৬। জালালুদ্দিন সুয়ুতী -> আশ শাফেয়ী
৭। ইবনে রজব -> হাম্বলী
৮। ইবনে আব্দুল বার -> মালেকী
৯। শাহ ওয়ালীউল্লাহ -> শাফেয়ী /হানাফী
১০। ইমাম নাসাঈ -> হাম্বলী
আরো অনেকের নাম
পরবর্তিতে আলাদা পোস্টে দেয়া হবে ইনশাল্লাহ

এই আলোচনায় যেটা শিখতে পারলাম :
এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা শিখতে পারলাম
“আল্লাহ এবং রসুলকে” অনুসরন করা অর্থ এই নয়
“কোরআন” , “হাদিস”
পড়ে সরাসরি নিজে যেটা বুঝলাম , নিজের
মনমতো সেটাই মানতে হবে । “কোরআন
হাদিসের নিজস্ব ব্যাখ্যা দেয়াই হোলো স্পষ্ট
গোমরাহীর লক্ষন যাদের জিন্দিক বলা হয়” ।
কোরআন হাদিসের অনুসরন করার পদ্ধতি হোলো ,
যেসকল ফকীহ মুজতাহিদ কোরআন হাদিস
বুঝে গেছেন , নিজের জীবনকে উৎসর্গ
করে গেছেন তাদের ব্যাখ্যা গ্রহন করা । অর্থ্যাৎ
“ফকীহ, মুজতাহিদ”কে শুধুমাত্র কোরআন হাদিসের
ব্যাখ্যাকার মনে করা , অন্য কিছু নয় ।
তাদেরকে অনুসরন করা বলতে তারা কোরআন
হাদিসের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন
সেটা মেনে চলা । এটাই সুন্নত
পদ্ধতি যা আমরা সাহাবীদের জীবন
পর্যালোচনা করে দেখতে পেলাম।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s